জন্মহার কমেছে। একই সঙ্গে কমেছে বয়স্কদের মৃত্যুহারও। জনবিন্যাসে পরিবর্তন আসছে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীনে। এতে বিপাকে পড়েছে সেখানকার বাজারে ব্যবসা চালানো স্থানীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিপণন কৌশলে পরিবর্তন আনছে দুগ্ধজাত পণ্য বাজারজাতকারী এসব প্রতিষ্ঠান। বদলে ফেলছে ‘টার্গেট মার্কেট’। এতদিন এসব কোম্পানি মূলত শিশুদের জন্য দুগ্ধপণ্য উৎপাদনে মনোযোগ দিয়ে থাকলেও এখন তাদের নজরে বয়স্ক জনগোষ্ঠী।
বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট যে অংশকে ঘিরে বিপণন কৌশল সাজানো হয় বিপণন পরিভাষায় সেটিকে অভিহিত করা হয় টার্গেট মার্কেট হিসেবে।
চীনের দুগ্ধপণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতা দিন দিন তীব্র হচ্ছে। এছাড়া জন্মহার ক্রমাগত কমতে থাকায় কোম্পানিগুলোকে টিকে থাকতে ভিন্ন প্রজন্মের ক্রেতাকে লক্ষ্যবস্তু করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। নিউজিল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান দি এটু মিল্ক কোম্পানি গত মাসে জানায়, চীনের প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য তারা নতুন গুঁড়া দুধ বাজারজাত করবে।
একই ধরনের পণ্যের দিকে মনোযোগ দিয়েছে ডানোন, অ্যাবোট, ফনটেরা ও নেসলের মতো বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো। এছাড়া স্থানীয় কোম্পানি ইলি ও ফেইহে পিছিয়ে নেই।
আয়ারল্যান্ডের খাদ্য বাজারজাতকারী সংস্থা বর্ড বিয়ার চীনের ব্যবস্থাপক কোনোর ও’সুলিভান বলেন, ‘বড়দের পুষ্টি চাহিদা ও স্পোর্টস নিউট্রিশনের পাশাপাশি এখন কোম্পানিগুলো দুগ্ধজাত পণ্য ব্যবহারের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরিতে ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘চীনের খাদ্য শিল্পের অনেক খাতে বর্তমানে চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি। এসব খাতে বিক্রি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনের জন্মহার রেকর্ড পরিমাণে কমে গেছে। ভারতের কাছে শীর্ষ জনসংখ্যাধারীর আসনও হারিয়েছে দেশটি। ২০২৩ সালে চীনে প্রতি হাজারে জন্মহার ছিল ৬ দশমিক ৪ জন। একই সঙ্গে গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় দেশটিতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়েছে অর্থনীতি ও ভোক্তাবাজারে।
বিশ্বে দুগ্ধজাত পণ্যের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ চীন। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রাবোব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, ২০৩২ সাল পর্যন্ত চীনে দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা গড়ে ২ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বাড়তে থাকবে। অন্যদিকে শিশুদের জন্য উৎপাদিত দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা কমতে থাকবে।
চলতি বছরের এক প্রতিবেদনে ডাচ বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান রাবোব্যাংকের বিশ্লেষক মিশেল হুয়াং উল্লেখ করেন, শিশুদের দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতা অনেক বেড়ে গেছে। এজন্য প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর দিকে মনোযোগ দেয়ার পাশাপাশি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
চীনে বিদেশী ডেইরি কোম্পানিগুলোর ব্যবসা শুরু আশির দশকে। এর মধ্যে ২০০৮ সালে স্থানীয় কোম্পানি সানলু গ্রুপের ফর্মুলা মিল্ক খেয়ে দেশটির হাজার হাজার শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। মূলত এ ঘটনার পর চীনের ভোক্তারা বিদেশী দুগ্ধজাত পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
কিন্তু দেশটির স্থানীয় কোম্পানিগুলো উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়ায় বিদেশী কোম্পানিগুলোর বাজার ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসছে। অটোমোবাইল থেকে শুরু করে কফি উৎপাদন—দেশটির সব খাতেই স্থানীয় উৎপাদন বেড়েছে। সরকারের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের নীতিমালার কারণেই মূলত দেশটির উৎপাদনে এ পরিবর্তন এসেছে।
ডেইরি খাতের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি বলেন, ‘চীনে আপনি সাধারণ মানের পাশাপাশি প্রিমিয়াম ব্যান্ড, সুপার প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড ও হাইপার প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের পণ্যও পাবেন। এখানে তীব্র প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে আবার স্থানীয় কোম্পানির উৎপাদন বাড়ছে।’
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কান্তার ওয়ার্ল্ডপ্যানেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জেসন উ বলেন, ‘চীনের প্রায় প্রতিটি শহরে স্থানীয় দুগ্ধজাত কোম্পানি রয়েছে। গত বছর দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারের ৮০ শতাংশ ছিল শীর্ষ ১০ কোম্পানির দখলে। এর মধ্যে পাঁচটি কোম্পানি চীনের।’ (খবর: এফটি)
ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি
ট্যাগঃ
মন্তব্য করুন