প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারণা ও বিজয়ের পর তাকে ঘিরে মার্কিন করপোরেটদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ওই সময় জেফ বেজোস মালিকানাধীন ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ ধনকুবেরদের সঙ্গে ট্রাম্পের সখ্য তুলে ধরে এমন একটি কার্টুন প্রকাশে অস্বীকৃতি জানায়। এসব ঘটনার মাঝে কিছু কোম্পানি থেকে মার্কিন ভোক্তাদের স্থায়ীভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার তথ্য দিয়েছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক জরিপে। কারণ কোম্পানিগুলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের এজেন্ডার সঙ্গে সংগতি রেখে নিজেদের নীতি পরিবর্তন করেছে।
মার্কিন ভোক্তাদের একটি অংশে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে ডাইভারসিটি, ইকুইটি ও ইনক্লুশন (ডিইআই) নীতির বাতিল। এর কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্ছিত হচ্ছে লাখ লাখ সংখ্যালঘু। এছাড়া বিলিয়নেয়ার ইলোন মাস্ককে এমন এক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যার পরামর্শে কর্মী ছাঁটাই করছে সরকারি সংস্থাগুলো। দ্য গার্ডিয়ানের জন্য জরিপটি করেছে মার্কিন জনমত ও বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান হ্যারিস পোল। যেখানে দেখা যাচ্ছে, অ্যামাজন, টার্গেট ও টেসলার মতো হাই-প্রোফাইল ব্র্যান্ডগুলো অর্থনৈতিক বয়কটের মুখোমুখি হচ্ছে। ভোক্তাদের এ প্রতিক্রিয়া বাজারে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
হ্যারিস পোলের প্রধান কৌশলবিদ লিবি রডনির মতে, কোম্পানি ও গ্রাহকরা উচ্চ ঝুঁকির ‘মোরগ লড়াইয়ে’ নেমেছে। যেখানে করপোরেশনগুলো নৈতিকতার চেয়ে ব্যবসায়িক কৌশলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে ক্রয়ক্ষমতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে গ্রাহকরা। তিনি বলেন, ‘২০ শতাংশ আমেরিকান স্থায়ীভাবে তাদের অভ্যাস পরিবর্তন করছেন। বয়কটকারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বলছেন, তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য এ সিদ্ধান্ত বজায় রাখবেন।’ কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বয়কটের বিষয়টি আলোচনার শীর্ষে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ৩৬ শতাংশ মার্কিন জানান, তারা এতে অংশ নিচ্ছেন বা নেবেন। বয়কটে বয়স, জাতি ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বয়কটকারীদের বড় অংশ জেনারেশন জেড বা জেন জি, যার পরিমাণ ৫৩ শতাংশ। এরপর মিলেনিয়াল প্রজন্মে ৪৬ শতাংশ। তবে তুলনামূলক কম সক্রিয় জেন এক্স ও বুমার্স, যথাক্রমে ৩০ ও ২২ শতাংশ।
জাতিগত বিবেচনায় বয়কটের পক্ষে সবচেয়ে কম রয়েছে শ্বেতাঙ্গ মার্কিনরা, মাত্র ২৯ শতাংশ। অন্যদিকে কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বয়কটের হার বেশি, যথাক্রমে ৫৩ ও ৫১ শতাংশ। রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ডেমোক্র্যাটরা, ৪৯ শতাংশ। এরপর রয়েছেন স্বাধীন ভোটার ও রিপাবলিকানরা, যথাক্রমে ৩২ ও ২৯ শতাংশ। বয়কটের কারণ হিসেবে মার্কিন ভোক্তাদের ৫৩ শতাংশ বলেছেন, তারা কোম্পানিগুলোকে কিছু বিষয় দেখিয়ে দিতে চান। যেমন গ্রাহকদের অর্থনৈতিক শক্তি ও প্রভাব। সরকারি নীতির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশে বয়কট করছেন ৪৯ শতাংশ। এছাড়া ৪৬ শতাংশ বলেছেন, ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের পর কোম্পানিগুলো বৈষম্যবিরোধী ডিইআই নীতি বাতিল করছে, এটিই বয়কটের অন্যতম কারণ।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বয়কটের সুনির্দিষ্ট প্রভাব নির্ধারণ করা কঠিন। তবে অনেক ভোক্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা বা ব্যক্তিগতভাবে কিছু কোম্পানি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। সম্প্রতি টার্গেট, অ্যামাজন ও ওয়ালমার্টের মতো বড় খুচরা বিক্রেতা ব্র্যান্ড কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ডিইআই উদ্যোগ কমিয়ে দিয়েছে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে সমালোচনার মুখে পড়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সংখ্যালঘু গোষ্ঠী থেকে নিয়োগের লক্ষ্য বাতিল করেছে টার্গেট। অন্যদিকে নারী মালিকানাধীন বা ছোট ব্যবসাকে অগ্রাধিকার না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়ালমার্ট। এখন অনেক মার্কিন মনে করেন, এসব কোম্পানি প্রেসিডেন্টের চাপে পড়ে নৈতিক মূল্যবোধ জলাঞ্জলি দিচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় আকারের অনুসারী রয়েছে বাল্টিমোরের পাদ্রি রেভারেন্ড জামাল ব্রায়ান্টের। সম্প্রতি অনুসারীদের লেন্ট উৎসব উপলক্ষে টার্গেট থেকে কেনাকাটা না করতে বলেন তিনি। টার্গেটফাস্ট ডট অর্গ নামের ওয়েবসাইটে জামাল ব্রায়ান্ট লেখেন, ‘এ নীতিগুলো শুধু করপোরেট সিদ্ধান্ত নয়; এগুলো একটি ন্যায়সংগত সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় নৈতিক ও নীতিগত প্রতিশ্রুতির অবক্ষয় তুলে ধরে। এবারের লেন্ট উৎসবে আমরা টার্গেট থেকে শুরু করে করপোরেট বর্জন পালন করব, যা প্রতিরোধের একটি আধ্যাত্মিক রূপ।’
একইভাবে হিস্পানিক কর্মীরা ‘লাতিনো ফ্রিজ মুভমেন্টের’ মাধ্যমে ডিইআই বাতিল করা কোম্পানি বয়কটের আহ্বান জানাচ্ছে। তারা বলছে, ‘এসব কোম্পানি যতক্ষণ না সংখ্যালঘু ও অভিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি মনোযোগী হওয়ার প্রমাণ দেয়, ততক্ষণ আমরা অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা করব না।’ অনেক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে সাংস্কৃতিক যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে ডিইআই নীতি। অনেক রক্ষণশীলের মতে, এটি শ্বেতাঙ্গ মার্কিনদের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীর প্রতি অবিচার। এখন কোম্পানিগুলো পরিবর্তিত আইনি পরিবেশের কারণে নীতি পরিবর্তনের অজুহাত দিচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈষম্য কমিয়ে আনার এ নীতি বিলোপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ক্ষমতায় এসেই একাধিক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের সব ডিইআই প্রোগ্রাম বাতিল করেন। সরকারের এ নীতির কারণে মার্কিন বেসরকারি খাতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে কিছু কোম্পানি গ্রাহক হারানোর ঝুঁকি সত্ত্বেও সরকারবিরোধী অবস্থান নিতে চাইছে না বা পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান
ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি
ট্যাগঃ
মন্তব্য করুন