ব্রিটেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মার্ক কার্নি কেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী হতে চান – The Finance BD
 ঢাকা     শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ০৫:১৩ অপরাহ্ন

ব্রিটেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মার্ক কার্নি কেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী হতে চান

  • ০৯/০৩/২০২৫

কার্নির রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন থাকলেও তিনি বহুবার তা এড়িয়ে গেছেন। ২০১২ সালে একবার এক সাংবাদিক তাকে রাজনীতিতে আসার পরিকল্পনা নিয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘তাহলে সার্কাস ক্লাউন হওয়াই ভালো!’ তবে ট্রুডোর পদত্যাগের ঘোষণার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
সাবেক ব্যাংক অব ইংল্যান্ড গভর্নর মার্ক কার্নিকে কানাডার লিবারেল পার্টির নতুন নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাস্টিন ট্রুডোর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে রাজনীতির মঞ্চে একেবারে নতুন কার্নি কি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে কানাডার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে পারবেন?
বিবিসির প্রতিবদেনে বলা হয়, ব্রিটিশ না হয়েও মার্ক কার্নি ২০১৩ সালে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর হওয়ার মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করেন, যা ছিল ব্যাংকের ৩০০ বছরের ইতিহাসে প্রথম।
এর আগে, তিনি ব্যাংক অব কানাডার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় কানাডার অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তবে অন্যান্য প্রধানমন্ত্রী পদপ্রত্যাশীদের মতো কার্নি কখনোই নির্বাচিত কোনো রাজনৈতিক পদে ছিলেন না। তারপরও তিনি লিবারেল পার্টির নেতৃত্ব প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে এগিয়ে বলে মনে করা হচ্ছে। দলীয় ভোটের মাধ্যমে নতুন নেতা নির্বাচিত হলে তিনিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী হবেন। তবে সামনে রয়েছে আরও কঠিন লড়াই—কানাডার আগামী সাধারণ নির্বাচন।
মার্ক কার্নি বিশ্বজুড়ে কাজ করলেও তার শেকড় কানাডার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত শহর ফোর্ট স্মিথে। এক স্কুল প্রধান শিক্ষকের সন্তান কার্নি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং বরফের দেশে জনপ্রিয় খেলাধুলা আইস হকি খেলতেন। পরে তিনি অর্থনীতিতে ডক্টরেট সম্পন্ন করেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে।
২০০৩ সালে তিনি কর্পোরেট দুনিয়া ছেড়ে ব্যাংক অব কানাডার উপ-গভর্নর হিসেবে যোগ দেন। এরপর কানাডার অর্থ মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট ডেপুটি মিনিস্টার হিসেবে কাজ করেন।
২০০৭ সালে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার ঠিক আগে, তিনি ব্যাংক অব কানাডার গভর্নর হন। তার নেতৃত্বে কানাডা অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে সক্ষম হয়, যা তাকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি একই কৌশল অবলম্বন করেন—ঋণনীতিকে সহজ করা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ২০১৩ সালে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের প্রধান হওয়ার পর তিনি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনেন। ব্যাংক তখন থেকে আর্থিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেয়, যা আগে ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস অথরিটির হাতে ছিল। তিনি ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি বদলান, সংবাদমাধ্যমে বেশি উপস্থিতি দেখান এবং সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা বাড়ান।
তার ‘ফরওয়ার্ড গাইডেন্স’ নীতির ফলে বাজারে স্থিতিশীলতা আসে, যদিও শুরুতে এই নীতি নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। এক পর্যায়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এক সদস্য তাকে ‘অবিশ্বস্ত প্রেমিক’ বলে কটাক্ষ করেন, যা পরে তার একটি আলোচিত পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। তবে অর্থনীতিবিদ হিসেবে নিরপেক্ষ থাকার বদলে তিনি রাজনৈতিক ইস্যুতেও মন্তব্য করেন। স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা গণভোট এবং ব্রেক্সিট নিয়ে তার বক্তব্য বিতর্ক তৈরি করে।
২০১৪ সালে তিনি সতর্ক করেছিলেন, স্বাধীন স্কটল্যান্ডকে ব্রিটিশ পাউন্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের শর্ত মেনে চলতে হতে পারে। ব্রেক্সিট নিয়ে ২০১৬ সালে তিনি সতর্ক করেন যে, ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলে ব্রিটেন মন্দার কবলে পড়তে পারে।
ব্রেক্সিট ভোটের পর, পাউন্ডের দরপতন হলে তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং বলেন যে ব্রিটেনের আর্থিক ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকবে। পরে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদের হার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মনিটারি পলিসি সহজ করে।
কার্নির রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন থাকলেও তিনি বহুবার তা এড়িয়ে গেছেন। ২০১২ সালে একবার এক সাংবাদিক তাকে রাজনীতিতে আসার পরিকল্পনা নিয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘তাহলে সার্কাস ক্লাউন হওয়াই ভালো!’ তবে ট্রুডোর পদত্যাগের ঘোষণার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
সাবেক অর্থমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ডের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের পর ট্রুডোর জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে কমে যায়। গুঞ্জন রয়েছে, ট্রুডো কার্নিকে অর্থমন্ত্রী করার পরিকল্পনা করেছিলেন। এখন কার্নি ও ফ্রিল্যান্ড দু’জনেই লিবারেল পার্টির নেতৃত্বের দৌড়ে আছেন।
প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে কার্নিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে কানাডার ওপর একের পর এক শুল্ক আরোপ করেছেন। এমনকি তিনি একবার মন্তব্য করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত কানাডাকে নিজেদের অঙ্গরাজ্য বানিয়ে ফেলা!
কার্নি অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে মোকাবিলার ব্যাপারে অভিজ্ঞ। ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি ফাইন্যান্সিয়াল স্টেবিলিটি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং বৈশ্বিক আর্থিক নিয়ন্ত্রকদের সমন্বয় সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সেই সময় জি-২০ সম্মেলনগুলোতে নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন এবং ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
রাজনীতিতে প্রবেশের আগেই কার্নি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। ২০১৯ সালে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কাজ শুরু করেন তিনি। পরে ২০২১ সালে তিনি গ্লাসগো ফাইন্যান্সিয়াল অ্যালায়েন্স ফর নেট জিরো চালু করেন, যা বিশ্বব্যাপী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই বিনিয়োগে উৎসাহিত করে।
কার্নির দাবি, সংকট মোকাবিলায় তার দক্ষতাই তাকে ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে কানাডার নেতা হিসেবে এগিয়ে রাখবে। সম্প্রতি এক নির্বাচনী বিতর্কে তিনি বলেন, আমি জানি কিভাবে সংকট সামাল দিতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞতা ও আলোচনার দক্ষতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এখন দেখার বিষয়, কানাডার লিবারেল পার্টি নেতৃত্ব নির্বাচনে কার্নি জয়ী হতে পারেন কি না এবং তিনি ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের বিরুদ্ধে কানাডাকে কতটা দৃঢ়ভাবে নেতৃত্ব দিতে পারেন।

ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি

ট্যাগঃ

মন্তব্য করুন

Leave a Reply




Contact Us