দেশটি তার ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ৭০ শতাংশ আমদানি করে। প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে এ পরিমাণ ৪০ শতাংশ। এছাড়া তামা, অ্যালুমিনিয়াম ও নিকেলের ক্ষেত্রে তা যথাক্রমে ৮০,৬৫ ও ৯৪ শতাংশ। আর পানির ওপর নির্ভরশীল কৃষি পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে এ নির্ভরতা প্রায় ১০০ শতাংশ।
বিশ্বব্যাপী মোট পণ্যসামগ্রী ব্যবহারে ৪০ শতাংশের হিস্যা চীনের। ফলে বৈশ্বিক চাহিদা নির্ধারণে দেশটি অন্যতম প্রভাবক। কয়লা ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও তামা ও নিকেলের মতো পণ্যে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থানে আছে চীন। তাই বেশিরভাগ জ্বালানি ও ধাতবপণ্যের জন্য আমদানির ওপরই নির্ভর করতে হয়। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগের বসবাস চীনে। তবে দেশটিতে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ বৈশ্বিক মোট জমির ১০ শতাংশেরও কম। পানিসম্পদও সীমিত। তাই বেশিরভাগ কৃষিপণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দেশটি আমদানি নির্ভর।
চীনের আমদানি নির্ভরতার ধারণা পেতে সবচেয়ে বেশি যে পণ্যের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন তা হল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল। দেশটি তার ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ৭০ শতাংশ আমদানি করে। প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে এ পরিমাণ ৪০ শতাংশ। এছাড়া তামা, অ্যালুমিনিয়াম ও নিকেলের ক্ষেত্রে তা যথাক্রমে ৮০,৬৫ ও ৯৪ শতাংশ। আর পানির ওপর নির্ভরশীল কৃষি পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে এ নির্ভরতা প্রায় ১০০ শতাংশ।
পণ্যবাজারে চীন প্রধান ভূমিকা পালন করলেও নিজস্ব চাহিদা পূরণে অক্ষমতা ও আমদানি নির্ভরতা দেশটির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। ১৯৮০–এর দশকে, চীন কর্তৃপক্ষ এ ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন হয়ে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করেছিল। এর মাধ্যমে তারা জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও বৈশ্বিক বাজারের যেকোনো অস্থিরতার সময় অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখতে চেয়েছিল। খনি নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা, বিদেশী উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে চীন তার উৎপাদন কাঠামো বজায় রেখেছে। একইসঙ্গে ২০০৮ সাল থেকে দেশটি পণ্যের কৌশলগত মজুদ বৃদ্ধি করছে। এ মজুদ সরবরাহ ব্যাঘাত বা দামের ওঠানামার সময় ‘সুরক্ষাকবজ’ হিসেবে কাজ করে। মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে পণ্য বাজারে ছাড়তে বা সংরক্ষণ করতে পারে। তবে স্পেনভিত্তিক বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান কায়শা ব্যাংক সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানায়, চীনের এমন মজুদ প্রবণতায় বৈশ্বিক পণ্যবাজারে ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি করছে।
দেশটির মজুদের প্রকৃত পরিমাণ ও সঞ্চয়ের নির্দিষ্ট হারও অজানা। তবে আমদানি প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৩ সালে তা রেকর্ড ৮১ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৪৫ শতাংশ ছিল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও ডেরিভেটিভস (জ্বালানি তেলজাত পণ্য)। এছাড়া ৩০ শতাংশ ছিল শিল্প ধাতু। ২০২৪ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর পর্যন্ত আমদানি আরো ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চীনের পণ্য মজুদ প্রবণতা বৃদ্ধির একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে দেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতা। তবে চলতি বছরের বৈশ্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশটির এ মজুদ বৃদ্ধির পেছনে অন্যান্য কারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পশ্চিমা সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রত্যাশা। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন শুল্ক। এসব ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মোকাবেলায় চীন তার মজুদ বাড়াচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, মালাক্কা প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব চীনের জন্য একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয়। কারণ মোট আমদানির দুই-তৃতীয়াংশ এ জলপথ দিয়ে আসে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, চীনের ধাতু ও খনিজ মজুদ বৃদ্ধি একটি সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির অংশ হতে পারে। বিশেষ করে, চীনের স্বর্ণের মজুদ এপ্রিল-ডিসেম্বর ২০২৪–এর মধ্যে ৪০০ শতাংশ বেড়েছে এবং মার্কিন ডলারভিত্তিক সম্পদের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি বছরজুড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ বজায় থাকতে পারে। তাই চীনও পণ্য মজুদের বর্তমান গতি বজায় রাখবে অথবা আরো বাড়াবে। চীনের এ বাড়তি চাহিদায় বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কাও বেশি।
ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি
ট্যাগঃ
মন্তব্য করুন