এক সময় মোবাইল ফোন শিল্পে অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম ছিল ‘নকিয়া’। ২০০০-এর দশকের শুরুতে বিশ্বব্যাপী ফোনের বাজারে রাজত্ব করছিল ফিনল্যান্ডভিত্তিক এ কোম্পানি।
২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় নকিয়া বৈশ্বিক মোবাইল ফোন বাজারের ৪০ শতাংশের বেশি দখলে রেখেছিল। ৩৩১০ মডেল ও এন-সিরিজের মতো আইকনিক ফোন তৈরি করেছিল নকিয়া। এসব ডিভাইস কিছুদিনের মধ্যেই স্থায়িত্ব, ব্যবহারকারীর জন্য সহজ ডিজাইন ও আধুনিক বৈশিষ্ট্যের জন্য খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। নকিয়ার নিজস্ব সিমবিয়ান অপারেটিং সিস্টেম ছিল বেশ প্রভাবশালী। কোম্পানির ফিচারফোনগুলো উন্নত ও উদীয়মান বাজারে ব্যাপক হারে বিক্রি হতো। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এবং স্মার্টফোনের প্রতি গ্রাহকদের আগ্রহ বাড়তে থাকায় নকিয়া পেছনে পড়ে যায়।
টেক জায়ান্ট গুগল ২০০৮ সালে অ্যান্ড্রয়েড চালু করে। এটি একটি ওপেন-সোর্স অপারেটিং সিস্টেম এবং বিভিন্ন ডিভাইসে ব্যবহার হতে পারে। অ্যাপলের আইওএস শুধু আইফোনে ব্যবহার হতো; অ্যান্ড্রয়েড স্যামসাং, এইচটিসি ও মটোরোলার মতো বিভিন্ন কোম্পানি ব্যবহার করছিল। এ ওপেন মডেল একটি বিশাল অ্যাপ ইকোসিস্টেম ও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা উন্নত করতে সাহায্য করে।
অ্যান্ড্রয়েড সেই সব নির্মাতাদের মধ্যে জনপ্রিয় হতে থাকে, যারা সিমবিয়ান ও ব্ল্যাকবেরি ওএসের মতো নির্দিষ্ট অপারেটিং সিস্টেমের বিকল্প খুঁজছিল। স্যামসাংয়ের মতো কোম্পানি দ্রুত এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন বাজারে আনে, যা মোবাইল ফোন শিল্পে হইচই ফেলে দেয়। অন্যদিকে নকিয়া সিমবিয়ানেই আটকে ছিল, যা অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হিমশিম খায়।
প্রযুক্তিবিদদের মতে, অ্যান্ড্রয়েডের উত্থান শিল্পে বড় পরিবর্তন আনলেও নকিয়ার নিজের সিদ্ধান্তই নিজেদের পতন ত্বরান্বিত করে। কোম্পানির একটি বড় ভুল ছিল অ্যান্ড্রয়েড প্রযুক্তি গ্রহণ না করা। যদিও নকিয়া নিজের লিনাক্সভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম ‘মি গো’ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে মি গো ব্যর্থ হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানটি একটি প্রতিযোগিতামূলক প্লাটফর্ম হারায়।
২০১১ সালে নকিয়ার সিইও স্টিফেন এলপ একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে মাইক্রোসফটের সঙ্গে একচেটিয়া অংশীদারত্ব গড়ে তোলেন। নকিয়া উইন্ডোজ ফোনকে তাদের প্রধান অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। পদক্ষেপটি অনেক নকিয়া ব্যবহারকারীর মনঃপূত হয়নি, কারণ তারা অ্যান্ড্রয়েডের আশা করেছিলেন। এদিকে উইন্ডোজ ফোনে প্রয়োজনীয় অ্যাপের সংখ্যা ছিল কম, আর ডেভেলপাররাও অ্যান্ড্রয়েডের মতো বেশি সমর্থন দেয়নি। স্যামসাং, হুয়াওয়ে ও অন্য নির্মাতারা দ্রুত অ্যান্ড্রয়েড ফোনের পরিসর বাড়াতে থাকলে নকিয়ার উইন্ডোজ ফোন তাদের কৌশল ধরতে ব্যর্থ হয়।
অ্যান্ড্রয়েড এরই মধ্যে জনপ্রিয় হতে শুরু করে ও স্যামসাংয়ের মতো কোম্পানিগুলো স্মার্টফোন শিল্পে পরিচিত নাম হয়ে ওঠে।
২০১২ সালে হার্ডওয়্যারের জন্য প্রশংসিত হওয়া নকিয়ার লুমিয়া সিরিজ উইন্ডোজ ফোনের সীমাবদ্ধতার কারণে পর্যাপ্ত গ্রাহককে আকর্ষণ করতে পারেনি।
পরের বছর নকিয়ার স্মার্টফোন বাজারের হিস্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়, ফলে কোম্পানিটি তার মোবাইল ব্যবসা মাইক্রোসফটকে ৭২০ কোটি ডলারে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। উইন্ডোজ মোবাইল ব্যবহার করে তারা নকিয়াকে গ্রাহকের কাছে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল, কিন্তু পরিকল্পনা সফল হয়নি।
২০১৬ সালের মধ্যে স্মার্টফোন বাজারে নকিয়ার উপস্থিতির সমাপ্তি ঘটে। মোবাইলের ইতিহাস পেছনে ফেলে নকিয়া এখন পুরোপুরি নেটওয়ার্ক প্রযুক্তির দিকে মনোযোগ দিয়েছে। —গিজমোচায়না অবলম্বনে
ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি
ট্যাগঃ
মন্তব্য করুন