আর্থিক নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নীতির কারণে সারা বিশ্বের ধনীদের কাছে সুইস ব্যাংকের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। অবৈধ অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবেও এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্নাম রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রবণতায় দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির বাইরে বসবাসরত ধনী মার্কিনদের সুইজারল্যান্ডে সম্পদ স্থানান্তরের আগ্রহ আগের তুলনায় বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতিসংক্রান্ত অনিশ্চয়তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ধনীরা সন্দিহান।
এফটি সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে প্রাইভেট ব্যাংকার, মাল্টি-ফ্যামিলি অফিস ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থা থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সুইসভিত্তিক ব্যাংক ও বিনিয়োগ অ্যাকাউন্ট খোলার বিষয়ে গ্রাহকদের আগ্রহ আগের তুলনায় বড় আকারে বেড়েছে। এর মধ্যে ঝামেলা এড়িয়ে চলতে মার্কিন কর আইন মেনে চলা অ্যাকাউন্টধারীরা সুইস ব্যাংক নিয়ে বেশি আগ্রহী। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান মাসেকোর সহপ্রতিষ্ঠাতা জশ ম্যাথিউস জানান, শেষবার ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় সুইস ব্যাংকের প্রতি মার্কিনদের এ ধরনের আগ্রহ দেখেছিলেন তিনি। ওই বছর মার্কিন ব্যাংকগুলোয় মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিসংক্রান্ত অনিশ্চয়তার কারণে সে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিদেশে ধনী গ্রাহকদের সম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি জানান, তারা বর্তমানে এক ধনী মার্কিন পরিবারকে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ডলার সুইজারল্যান্ডে স্থানান্তর করতে সহায়তা করছেন।
গ্রাহক বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে জেনেভাভিত্তিক সুইস প্রাইভেট ব্যাংক পিক্টেট। সংস্থাটি বলছে, তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান পিক্টেট নর্থ আমেরিকা অ্যাডভাইজারসে নতুন ও পুরনো মার্কিন গ্রাহকদের কাছ থেকে পরিষেবার চাহিদা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়তে দেখছে। সংস্থাটি মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (এসইসি) নিবন্ধিত, অর্থাৎ বৈধভাবে সম্পদ স্থানান্তর করে। অবশ্য ইচ্ছা করলেই মার্কিনরা সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে না। কারণ তাদের সামনে রয়েছে ফরেন অ্যাকাউন্ট ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স অ্যাক্টের (এফএটিসিএ) মতো কঠোর বিধিনিষেধ। এ আইনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের কর বিভাগকে (আইআরএস) মার্কিন অ্যাকাউন্টধারীদের তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য বিদেশী ব্যাংকগুলো। যদি কোনো সুইস সম্পদ বা বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক এসইসিতে নিবন্ধিত থাকে, তবে তারা গ্রাহকদের সুইস অ্যাকাউন্ট খুলতে ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করতে পারে। পিক্টেট হলো সুইস ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম, যারা মার্কিন গ্রাহকদের জন্য এসইসি নিবন্ধিত সেবা দেয়। মার্কিন আর্থিক নীতির এ প্রস্তুতিগুলো প্রমাণ করে যে আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে সুইজারল্যান্ডের শক্ত অবস্থান এখনো অটুট রয়েছে। অবশ্য মাঝে ইউক্রেনে রুশ আক্রমণের পর দেশটির নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তা সত্ত্বেও বিশ্বের ক্রস-বর্ডার সম্পদ ব্যবস্থাপনা গন্তব্য হিসেবে সুইজারল্যান্ড এখনো শীর্ষে। জুরিখভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান আলপেন পার্টনারসের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা অংশীদার পিয়ের গ্যাব্রিস জানান, মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে বসবাসের স্থান ও সম্পদ সংরক্ষণের বিকল্প নিয়ে ভাবনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ গ্রাহকদের অনেকেই আন্তর্জাতিক পরিসর থেকে এসেছেন, যেমন ইসরায়েলি বা ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা।
পিয়ের গ্যাব্রিস বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, গত কয়েক মাস এ প্রবণতা চলমান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কিছু গ্রাহক ট্রাম্পবিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন এবং তাদের অনেকে আশঙ্কার কারণে নতুন এ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।’
আর্থিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে মার্কিন ডলার কিছুটা ঝুঁকিতে রয়েছে। বিষয়টি ইঙ্গিত করে পিয়ের গ্যাব্রিস জানান, মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলছেন অনেক গ্রাহক। অবশ্য সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট বিষয়ে গ্রাহক আগ্রহে বড় ধরনের হেরফের দেখেননি বলে জানান অপেক্ষাকৃত কম লেনদেন করে এমন এক মার্কিন সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের প্রধান। তিনি জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সুইস ব্যাংকগুলো এখন মার্কিন গ্রাহকদের নিয়ে আগের তুলনায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। কারণ সংশ্লিষ্ট করসংক্রান্ত জটিলতাগুলো আগের তুলনায় ভালোভাবে সামাল দিতে পারছে সুইস ব্যাংকগুলো। একসময় এ ধরনের ঘটনায় বিলিয়ন ডলার জরিমানা দিতে হয়েছিল। মার্কিন কর্তৃপক্ষ ২০০৮ সাল থেকে কয়েক ডজন সুইস ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। এ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তারা মার্কিন নাগরিকদের কর ফাঁকি দিয়ে গোপন অ্যাকাউন্ট পরিচালনার সুযোগ দিত।
সুইস ব্যাংকগুলো ২০১৩ সালে মার্কিন কর আইন মেনে নিতে পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়ায়। ওই সময় থেকে তারা এফএটিসিএর নীতি অনুযায়ী তথ্য দিতে শুরু করে এবং মার্কিন অ্যাকাউন্টধারীদের তথ্য ভাগাভাগিতে সম্মত হয়। অবশ্য এ নতুন ব্যবস্থা অনুসরণ করতে গিয়ে কিছু সুইস ব্যাংকের জন্য মার্কিন গ্রাহক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একজন সম্পদ ব্যবস্থাপক জানান, এখন সুইস ব্যাংকগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত সংস্থা পরিচালনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ অনুসারে, গ্রাহকদের সম্পদ সুইজারল্যান্ডে রাখা হলেও তা মার্কিন ব্যাংকারদের তত্ত্বাবধানে থাকে এবং মার্কিন সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের নিয়মের আওতায় পরিচালিত হয়। মার্কিন আইন মেনে চলতে গিয়ে সুইস ব্যাংকগুলোর পুরনো গোপনীয়তা নীতি এখন অনেকটাই ক্ষুণ্ন হচ্ছে। মার্কিন নীতি মেনে চললেও সুইস ব্যাংকের নির্ভরযোগ্যতা, স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগের বৈচিত্র্য যুক্তরাষ্ট্রের ধনী নাগরিকদের জন্য এখনো আকর্ষণীয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি
ট্যাগঃ
মন্তব্য করুন