উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ে পা রাখতে যাচ্ছে বাংলাদেশ, যেখানে নাম মাত্র বা সহজ শর্তের ঋণ সুবিধা আর থাকবে না। বিশ্বব্যাংকের ৩ বছরের রেয়াতি ঋণ চক্র আইডিএ-২১ এর অধীনে—আগামী জুলাই থেকেই তা হতে চলেছে।
নির্দিষ্ট সুদহার ও ঋণ পরিশোধের কম মেয়াদ
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা জানান, জুনে শেষ হতে চলা বর্তমান ঋণ চক্রের অধীনে বাংলাদেশ ৮৩৪ মিলিয়ন ডলার নাম মাত্র সুদহারে ঋণ নিতে পারবে। বিশ্বব্যাংকের রেয়াতি ঋণ প্রদানকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ) এখন বাংলাদেশকে ‘ব্লেন্ড’ কান্ট্রি শ্রেণিভুক্ত করে ১.৫ শতাংশ সুদে, পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ডে ঋণ দেবে। পরিশোধের মেয়াদ হবে ২৫ বছর। বর্তমানে পরিশোধের মেয়াদ ৩০ বছর, আইডিএ’র নতুন ঋণচক্রে মেয়াদ আরও কম হওয়ার কারণে কিস্তির পরিমাণও বাড়বে।
আইডিএ ২০ (জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত) এর সুদহার হচ্ছে ১.২৫ শতাংশ, আর সার্ভিস চার্জ বাবদ যোগ হয় আরও শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ। এই ঋণ চক্রের আওতায় ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণচুক্তি হয়েছে। এছাড়া, আইডিএ-২১ এর অধীনে বিশ্বব্যাংকের মূল আইডিএ ঋণের ১৫ শতাংশ বাজার-ভিত্তিক ভাসমান সুদহারে গ্রহণের সুযোগ থাকবে। এটি মাইনাস ২৫০ বেসিস পয়েন্টের ভিত্তিতে, ইণ্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইবিআরডি)-র সংশ্লিষ্ট হতে পারে।
আর্থিক চাপ ও অর্থনৈতিক জটিলতা বাড়বে
নাম মাত্র সুদহারের ঋণ শেষ হওয়ার ঘটনা অতি-সহজ শর্তের অর্থায়ন সুবিধা না পাওয়ার গুরুত্বকে তুলে ধরছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মধ্যে আছে, রয়েছে আর্থিক সীমাবদ্ধতা, এরমধ্যে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের খরচও আরও বাড়বে।
অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন এবং বাজেট ঘাটতি পূরণে— বাংলাদেশ অনেক বছর ধরেই কম সুদের বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভর করেছে, এই অবস্থায় নাম মাত্র সুদহারে ঋণ সুবিধা শেষ হওয়া অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি প্রেক্ষাপটকেও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
ইআরডির সিনিয়র এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশ মধ্য আয়ের স্ট্যাটাসের দিকে এগোচ্ছে, এই অবস্থায় এটা হওয়াই ছিল অবধারিত। এখন থেকে বিদেশি ঋণ আমরা কীভাবে ব্যবহার করব— সে বিষয়েও আরও বিচক্ষণতার সাথে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুশৃঙ্খল আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও দক্ষভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়া— বিদেশি ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে দেনার বোঝাও বাড়তে পারে।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, আমাদের অর্থনীতির আকার বাড়ছে। মাথাপিছু আয় বাড়ছে। ফলে বিশ্বব্যাংকের ঋণ দিন দিন আরো ব্যয়বহুল হবে। আগের মতো নাম মাত্র সুদে বা সহজ শর্তে নমনীয় ঋণ আর আমরা পাব না। ক্রমাগত এটা কমে আসবে। তবে আগামী তিন বছরে যে শর্তে আমরা বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ পাব, তা অনেক বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, দ্বি-পাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার ঋণের শর্তের চেয়ে কঠিন হবে না।
“এই অবস্থায় আমাদের ঋণের সঠিক ও কৌশলী ব্যবহার করতে হবে। বিনিয়োগবান্ধব প্রকল্প যেগুলো সহজেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিবে, সেসব প্রকল্প নিতে হবে। একইসঙ্গে বৈদেশিক ঋণের অর্থের যে অপচয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে যাতে দুর্নীতি নাহয়— সেদিকেও জোর দিতে হবে। পাশাপাশি সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে,” তিনি যোগ করেন।
আইডিএ-২১ এর অধীনে নতুন সুদহার ও সুযোগগুলো
আইডিএ-২১ এর অধীনে ‘ব্লেড কান্ট্রি’ ২৫ বছর মেয়াদি ঋণ পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ নিতে পারবে। যেখানে স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস (এসডিআর) – এর ১.৫ শতাংশ সুদহার নির্দিষ্ট থাকবে, তবে কোনো সার্ভিস চার্জ দিতে হবে না। ভাসমান হারের ঋণও নেওয়া যাবে, যেখানে সুদহার আইবিআরডি গ্রুপ ‘এ’-র হারের মাইনাস ২৫০ বেসিস পয়েন্ট হবে।
ব্লেন্ড কান্ট্রি বা মিশ্র ঋণ সুবিধার আওতায় থাকা দেশগুলো চাইলে নির্দিষ্ট সুদহারেও ঋণ নিতে পারবে, সেক্ষেত্রে ভাসমান সুদহারের চেয়ে ১৫ শতাংশ বরাদ্দ ছাড় পাওয়া যাবে। বাজারভিত্তিক সুদের উঠানামার প্রভাবকে কম রাখতে, সুদহার ৫ শতাংশ বেঁধে দেওয়া হবে।
ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, ২০১৬ সাল থেকেই বিশ্বব্যাংকের স্কেল-আপ উইন্ডো থেকে বাজারভিত্তিক সুদহারের ঋণ নিচ্ছে বাংলাদেশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)-র মতো ঋণদাতারাও বাজারভিত্তিক রেটে ঋণ দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে ১.২৫ শতাংশ সুদ, এবং দশমিক ৭৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জের চেয়ে নতুন ১.৫ শতাংশ এসডিআর সুদহার কিন্তু কম। এছাড়া নির্ধারিত সুদহারে ঋণের বেলায়ও ১৫ শতাংশ অ্যালোকেশন ডিসকাউন্ট পাওয়া যাবে। তবে আগের চেয়ে উইন্ডো সাইজ কম হবে।’
আইডিএ-২১ এর বরাদ্দ ও আসন্ন ঘোষণা
বিশ্বব্যাংকের নথি বলছে, ১০০ বিলিয়ন ডলারের হতে পারে আইডিএ-২১। বিদ্যমান আইডিএ-২০ এর ৯৩ বিলিয়ন ডলার থেকে যা ৮ শতাংশ বেশি। এপ্রিলে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় বিভিন্ন দেশের জন্য নির্ধারিত ঋণ বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হবে।
আইডিএ-২০ এর অধীনে বাংলাদেশের জন্য নির্দেশিত বরাদ্দ ছিল এসডিআরে ২,৪৫২.৭ মিলিয়ন। ঋণের চাহিদা ও পারফরম্যান্স অনুযায়ী, পারফরম্যান্স ভিত্তিক বরাদ্দ (পিবিএ) ব্যবস্থার ভিত্তিতে আইডিএ’র ঋণ বরাদ্দ প্রতিবছর নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।
ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি
ট্যাগঃ
মন্তব্য করুন