এসআইপি-এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ১০ কোটির বেশি, যা পাঁচ বছর আগে ছিল মাত্র ৩.৪ কোটি। অনেকেই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন না হয়েই উচ্চ মুনাফার আশায় বিনিয়োগে নেমেছেন।
দুই বছর আগে ব্যাংক পরামর্শদাতার পরামর্শে রাজেশ কুমার নামে এক ব্যক্তি ব্যাংকে থাকা ফিক্সড ডিপোজিটসহ অন্যান্য সঞ্চয় তুলে ফেলেন। ভারতের শেয়ারবাজার সংক্রান্ত বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরে সেসব সঞ্চয়ের অর্থ তিনি মিউচুয়াল ফান্ড, স্টক ও বন্ডে বিনিয়োগ করেন।
ভারতের শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিহারের এই প্রকৌশলী লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর দলে যোগ দেন। ছয় বছর আগে, ১৪ জনের মধ্যে মাত্র একজন ভারতীয় পরিবার তাদের সঞ্চয় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করত। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন।
কিন্তু পরিস্থিতি বদলে গেছে।
গত ছয় মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি তুলে নিতে শুরু করেছে। এছাড়া উচ্চ মূল্যায়ন থাকলেও আয় কমেছে এবং বৈশ্বিক মূলধন চীনমুখী হওয়ায় ভারতের বাজার পড়তে শুরু করেছে। গত সেপ্টেম্বর থেকে বিনিয়োগকারীদের সম্পদের মূল্য ৯০০ বিলিয়ন ডলার হ্রাস পেয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক-সংক্রান্ত ঘোষণার আগে থেকেই বাজারে পতন শুরু হয়েছিল, যা পরবর্তী ঘটনাবলীর কারণে আরও বেড়েছে।
ভারতের বেঞ্চমার্ক নিফটি ৫০ সূচক দেশের শীর্ষ ৫০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির পারফরম্যান্স ট্র্যাক করে। এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৯ বছরে ভারতের শেয়ারবাজার দীর্ঘতম পতনের শিকার হয়েছে এবং এটি টানা পাঁচ মাস ধরে নিম্নমুখী। এটি বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল বাজারের জন্য বড় ধাক্কা। স্টক ব্রোকারদের মতে, তাদের লেনদেনের পরিমাণ এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে।
৫৫ বছর বয়সী রাজেশ কুমার বলেন, “গত ছয় মাস ধরে আমার বিনিয়োগ লাল সংকেতে রয়েছে। গত এক দশকে শেয়ারবাজারে এটাই আমার সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা।”
তিনি এখন ব্যাংকে কম টাকা রাখেন এবং তার বেশিরভাগ সঞ্চয় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছেন। আগামী জুলাই মাসে তার ছেলের ১৮ লাখ রুপি, অর্থাৎ ২০ হাজার ৬৫০ মার্কিন ডলার বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ফি বকেয়া পরিশোধ করতে হবে। তিনি বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, “আমি লোকসানে বিনিয়োগ বিক্রি করতে চাই না। বাজার পুনরুদ্ধার হলে কিছু টাকা ব্যাংকে ফেরত রাখার কথা ভাবছি।”
এমন উদ্বেগে রয়েছে ভারতের লাখ লাখ মধ্যবিত্ত পরিবার। তারা প্রত্যেকেই বিভিন্ন ছোট-বড় শহর থেকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন।
বিনিয়োগের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হলো সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (এসআইপি)। এখানে মাসে নির্দিষ্ট জমার বিপরীতে তহবিল গঠন করা হয়। এসআইপি-এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ১০ কোটির বেশি, যা পাঁচ বছর আগে ছিল মাত্র ৩.৪ কোটি। অনেকেই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন না হয়েই উচ্চ মুনাফার আশায় বিনিয়োগে নেমেছেন। তাদের প্রভাবিত করতে বিশেষভাবে ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের ইনফ্লুয়েন্সাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কেটিং ম্যানেজার তরুণ সিরকার ভারতের নতুন বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি হতে পারতেন। তার পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড পরিপক্ক হওয়ার পর, তিনি তার অবসর নিরাপদ করার জন্য একটি পথ খুঁজছিলেন। অতীতের স্টক মার্কেটের ক্ষতির অভিজ্ঞতার কারণে এবার তিনি একজন পরামর্শদাতার সহায়তা নিয়ে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করেন।
তিনি বলেন, “আমি আমার সঞ্চয়ের ৮০ শতাংশ মিউচুয়াল ফান্ডে রেখেছি। আর মাত্র ২০ শতাংশ রেখেছি ব্যাংকে। এখন আমার পরামর্শদাতা সতর্ক করে বলছেন, হার্ট অ্যাটাক এড়াতে চাইলে ছয় মাসের জন্য বিনিয়োগের অবস্থা দেখবেন না!”
তিনি এখনও নিশ্চিত নন যে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ তার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল কি না। তিনি অকপটে বলেন, “আমি একই সঙ্গে অজ্ঞ ও আত্মবিশ্বাসী। বাজার কেন এমন আচরণ করছে তা বুঝি না, তবে ইনস্টাগ্রামের তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা এটিকে সহজ উপার্জনের পথ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে জানি, প্রতারণার ফাঁদেও পড়তে পারি।”
তিনি জানান, টিভি শো ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের আলোচনায় মুগ্ধ হয়ে তিনি শেয়ারবাজারে আকৃষ্ট হন।
তরুণ সিরকারের অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের কিশোর-কিশোরীরাও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করে। এমনকি একবার ব্যাডমিন্টন খেলতে গিয়ে এক কিশোর তাকে টেলিকম স্টকে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছিল। তিনি বলেন, “চারপাশে যখন এসব শুনতে শুরু করি, তখন মনে হলো আমারও চেষ্টা করা উচিত। তাই করলাম, আর তারপরই বাজার ধসে পড়ল।” তবে তিনি আশাবাদী, শেয়ারবাজার অবস্থার পরিবর্তন হবে।
অনেকে আরও বেশি ঝুঁকি নিয়ে ইতিমধ্যেই ক্ষতির মুখ দেখেছেন। পশ্চিম ভারতের ছোট শিল্পশহরের হিসাবরক্ষক রমেশ (ছদ্মনাম) মহামারির সময় ইউটিউবের তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ধার করা টাকা বিনিয়োগ করেন।
তিনি ঝুঁকিপূর্ণ পেনি স্টক ও ডেরিভেটিভ ট্রেডিংয়ে জড়ান এবং সম্প্রতি এক হাজার ৮০০ ডলারের মতো (তার বার্ষিক বেতনের বেশি) হারিয়ে ব্রোকারেজ অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এই টাকা ধার করা ছিল, এখন পাওনাদাররা চাপ দিচ্ছে।”
রমেশ ১.১ কোটি ভারতীয় বিনিয়োগকারীর মধ্যে একজন, যারা নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপের আগে ফিউচার ও অপশন ট্রেডে সম্মিলিতভাবে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হারিয়েছেন।
আর্থিক উপদেষ্টা সমীর দোশি বলেন, “এই ধস কোভিডকালীন পতনের মতো নয়। তখন পুনরুদ্ধারের পথ ছিল, কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এখন অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।”
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, স্বল্প খরচের ব্রোকারেজ ও সরকার-চালিত আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ফলে বিনিয়োগ এখন অনেক সহজ হয়েছে। স্মার্টফোন ও ব্যবহারকারী-বান্ধব অ্যাপ বাজারে প্রবেশ সহজ করেছে এবং তরুণ প্রজন্ম ঐতিহ্যবাহী বিনিয়োগের বিকল্প খুঁজছে। কিন্তু অনেক নতুন বিনিয়োগকারীর বাস্তবতা যাচাইয়ের প্রয়োজন।
লেখক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মনিকা হ্যালান বলেন, “শেয়ারবাজার জুয়ার আসর নয়, প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত হতে হবে। কমপক্ষে সাত বছর ধরে দরকার হবে না এমন অর্থই বিনিয়োগ করুন। আপনি যদি ঝুঁকি নেন, তবে নিজেকে প্রশ্ন করুন, আমি কতটা হারাতে পারি এবং সেই ক্ষতি সামলাতে পারবো কিনা।”
এই বাজার ধসের কারণে ভারতের মধ্যবিত্তদের সময় খারাপ যাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর, মজুরি স্থবির, বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দা, আর চাকরির সুযোগ কমছে। অনেক নতুন বিনিয়োগকারী এখন অপ্রত্যাশিত ক্ষতির মুখোমুখি হয়ে আছেন।
শেষ পর্যন্ত, বাজারের মন্দা নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় শিক্ষা হতে পারে। মনিকা হ্যালান বলেন, “তিন বছর ধরে ২৫ শতাংশ রিটার্ন স্বাভাবিক নয়। বাজার বুঝতে না পারলে আমানত ব্যাংকে কিংবা সোনায় বিনিয়োগ করাই ভালো।”
ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি
ট্যাগঃ
মন্তব্য করুন