কফির দাম ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ, তবে হাসি নেই উৎপাদকদের মুখে – The Finance BD
 ঢাকা     শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ০৬:০৫ পূর্বাহ্ন

কফির দাম ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ, তবে হাসি নেই উৎপাদকদের মুখে

  • ২৬/০২/২০২৫

কফির দাম বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তন– যা বিশ্বব্যাপী কফির উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বের শীর্ষ দুই কফি উৎপাদক দেশ ব্রাজিল ও ভিয়েতনামে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা ও অতিবৃষ্টি কফি চাষের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
হন্ডুরাসের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাহাড়ে অবস্থিত ফিনকা এল পুয়েন্তে কফি ফার্মে এখন আনন্দের দিন হওয়ার কথা। কারণ বিশ্ববাজারে সাধারণ কফির দাম গত এক বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এই ফর্মে উৎপাদিত বিশেষ জাতের কফি বরাবরই উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়– যা স্বাদ ও সুগন্ধের জন্য বিখ্যাত। সিয়াটল থেকে সিউল পর্যন্ত একে উৎকৃষ্ট ওয়াইনের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
তবু ফার্মের মালিক মেরিসাবেল ক্যাবায়েরো ও তার স্বামী মইসেস হেরেরা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় বেশি মজুরি দিতে হচ্ছে, চাষের বিভিন্ন সারও হয়ে উঠেছে ব্যয়বহুল। অনিয়মিত বৃষ্টি ও তাপমাত্রা ওঠা-নামার কারণে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ফলে দাম বাড়লেও গত বছরের তুলনায় আয় কম হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, কফির উচ্চমূল্যের কারণে ক্রেতারা তুলনামূলক সস্তা পানীয়, যেমন– সোডা বা এনার্জি ড্রিংকের দিকে ঝুঁকতে পারেন। ফলে কমে যেতে পারে কফির চাহিদা।
কফির দাম বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তন– যা বিশ্বব্যাপী কফির উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বের শীর্ষ দুই কফি উৎপাদক দেশ ব্রাজিল ও ভিয়েতনামে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা ও অতিবৃষ্টি কফি চাষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এ উদ্বেগ শুধু ফিনকা এল পুয়েন্তের নয়, অন্যান্য কফি ফার্মের মালিকরাও একই শঙ্কায় ভুগছেন। আজ তারা বেশি দাম পাচ্ছেন, কিন্তু কোনো দুর্যোগ হলে ব্যবসায় ধস নামতে পারে।
ফিনকা এল পুয়েন্তেও পরিস্থিতি অনিশ্চিত। ডিসেম্বরে ও জানুয়ারিতে অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে ফসল নষ্ট হয়েছে। এরপর বৃষ্টি দেরিতে হওয়ায় শ্রমিকরা সময়মতো কফি তুলতে পারেননি। ফলে রেকর্ড মূল্যে কফি বিক্রির সুযোগ থাকলেও তা তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে ওঠার বদলে নতুন সমস্যার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে অনেকে কফির দাম বৃদ্ধিকে দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও পরিবেশগত ক্ষতির বিরুদ্ধে ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে কফি উৎপাদকরা ন্যায্য মূল্য পাননি, এখন সেই পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
‘ফেয়ারট্রেড আমেরিকা’র নির্বাহী পরিচালক আমান্ডা আর্কিলা বলেন, “পুরনো উৎপাদন পদ্ধতিগুলো মাটির উর্বরতা নষ্ট করেছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হয়েছে। কফি শিল্পে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ করতে চাইলে আমাদের অবশ্যই উচ্চমূল্যের দিকে যেতে হবে।”
বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ কফি উৎপাদিত হয় ১ কোটি ২৫ লাখ ক্ষুদ্র খামারে, যেগুলোর অধিকাংশের আয়তন ৫০ একরেরও কম। বিশ্ব কফি গবেষণা সংস্থার তথ্যানুসারে, এসব ক্ষুদ্র উৎপাদকের প্রায় ৪৪ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি কফি চাষীরা ন্যায্য দাম পান, তবে তারা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সক্ষম কফির জাত চাষে মনোযোগী হতে পারবেন। তারা ছায়াযুক্ত গাছ লাগিয়ে মাটির উর্বরতা রক্ষা করতে পারবেন। এতে ভবিষ্যতে বাজারের অস্থিরতা সামলানো সহজ হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ফার্ম পরিচালনায় স্থিতিশীলতা আসবে।
মহামারি যেমন বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিয়েছিল এবং ওষুধ থেকে চিপস পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল, তেমনি কফির মূল্যবৃদ্ধিও এর উৎপাদন পরিস্থিতির প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই নতুন বাস্তবতা কফি উৎপাদকদের ভাগ্যে পরিবর্তন আনতে পারবে কি না।

কফির ইতিহাস এক অর্থে শোষণেরই ইতিহাস। সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমানোর লক্ষ্যে এই শোষণ যুগ যুগ ধরে ঘটেছে।
ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায় কফির বাগান তৈরি করেছিল ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার চাহিদা মেটাতে। তারা আফ্রিকান শ্রমিকদের দাস বানিয়ে খাটিয়েছে, স্থানীয়দের জমি কেড়ে নিয়েছে, এবং বন-জঙ্গল নির্বিচারে কেটে কফির গাছ লাগিয়েছে। কফিকে বিলাসপণ্য থেকে নিত্যপণ্যে রূপান্তর করতে মানবিক দুর্ভোগসহ পরিবেশগত ক্ষতিসাধন করা হয়েছে।
কফি শিল্প এখনও ব্যাপক উৎপাদন ও সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। কলম্বিয়া থেকে কেনিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে উৎপাদিত কফি সংগ্রহ করে সবুজ বীজ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায়, যেমন– বুটিক রোস্টারি থেকে শুরু করে বড় কৃষি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠানো হয়। এতে একদিকে লাতিন আমেরিকা, এশিয়া ও আফ্রিকার শ্রমিকরা দৈনিক মাত্র ২ ডলার আয় করেন, অন্যদিকে কোপেনহেগেন, দুবাই বা বোস্টনের ভোক্তারা এক কাপ ক্যাপুচিনোর জন্য এর দ্বিগুণের বেশি খরচ করেন।
এই শিল্পে মূলত লাভের বড় অংশ চলে যায় বৃহৎ কফি ব্যবসায়ীদের কাছে। কফি বীজের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মুনাফাও বেড়েছে, অথচ বাড়তি মুনাফার অংশ অনেক উৎপাদকার কাছে পৌঁছায়ই না।
ফোলজার্স ও ক্যাফে বুস্টেলো ব্র্যান্ডের মালিক জে. এম. স্মাকার কোম্পানি গত আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা কফি বিক্রিতে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখেছে, যেখানে তাদের লাভের হার ২৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে। কোম্পানির নির্বাহীরা বিনিয়োগ বিশ্লেষকদের জানিয়েছেন, তারা কফির অতিরিক্ত ব্যয় সরাসরি ভোক্তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন দুর্যোগ, যেমন– খরা, অতিবৃষ্টির কারণে কফি সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে উঠেছে, পাশাপাশি নতুন চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করেছে। ব্রাজিল ও ভিয়েতনামে খরার কারণে উৎপাদন কমে গেছে, আবার আন্তর্জাতিক শিপিং ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটায় কফি বিন সরবরাহ সংকটের মুখে পড়েছে। উপরন্তু, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন বন উজাড়বিরোধী আইন কফি বাণিজ্যে নতুন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করেছে।
ভিয়েতনামের অনেক ফার্ম এখন কম দামি রোবাস্টা কফি ছেড়ে ডুরিয়ান ফল চাষের দিকে ঝুঁকছে। এছাড়া, সস্তা রোবাস্টার বিকল্প হিসেবে রোস্টাররা এখন মানসম্পন্ন ও ব্যয়বহুল অ্যারাবিকা বিনের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। এর ফলে কফির সরবরাহ আরও কমে যাচ্ছে এবং দাম বাড়ছে।
গত দুই দশকে হন্ডুরাসের করকুইন শহরের কফি চাষী সার্জিও রোমেরো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি একটি টেকসই চাষাবাদ মডেল গড়ে তুলেছেন।
কৃষি প্রকৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষিত রোমেরো তার কফি গাছকে প্রতিকূলতা থেকে বাঁচানোর উপায় হিসাবে ছায়াযুক্ত চাষ পদ্ধতির ধারণা দেন– যেখানে পাইন ও মেহগনির মতো উঁচু গাছের ছায়ায় কফি চাষ করা হবে। এতে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা সম্ভব হবে এবং শিকড় পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টি শোষণ করতে পারবে। পাশাপাশি আম, কমলা, লেবু ও কলার মতো ফলগাছ লাগিয়ে মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখার পাশাপাশি কৃষিপণ্যও বৈচিত্র্যময় করা হবে।
২০০৯ সালে তিনি ১৪০ একর জমিকে একটি সম্মিলিত খামারে রূপান্তর করেন, যেখানে টেকসই কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। পরে তিনি আরও দুই ডজন ফার্মকে একত্র করে ‘কাফিকো’ নামে একটি সমবায় গঠন করেন।
এর মাধ্যমে কৃষকেরা উন্নত চাষপদ্ধতি শিখতে পারছেন, উপযুক্ত কফি গাছ ও ছায়াযুক্ত গাছের চারা উৎপাদনের জন্য নার্সারি চালাতে পারছেন এবং নিজেদের ফসল প্রক্রিয়াজাত করে সরাসরি বাজারে বিক্রিও করতে পারছেন। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বাদ দিয়ে তারা সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করেছেন।
শুরুতে এই মডেল নিয়ে সন্দিহান ছিলেন অনেকে। কারণ চাষের খরচ ২০ শতাংশ বেশি হলেও ফলন ২৫ শতাংশ কম ছিল। তবে এই গাছগুলো ২৫ বছর পর্যন্ত টিকে থাকবে, আর উন্নত মানের কফি উৎপাদিত হবে– যা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব।
রোমেরো বলেন, “আজ অনেকেই এই মডেল অনুসরণ করছেন। শুরুতে সবাই আমাদের পাগল ভাবলেও এখন সবাই আমাদের পথেই হাঁটছেন।”
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই দাম বৃদ্ধি কি কফি উৎপাদনের টেকসই পদ্ধতি নিশ্চিত করবে? যদি কৃষকেরা প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষ করেই উচ্চমূল্যে বিক্রি করতে পারেন, তাহলে ছায়াযুক্ত গাছ লাগানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে তারা আগ্রহী হবেন কেন?

ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি

ট্যাগঃ

মন্তব্য করুন

Leave a Reply




Contact Us