মার্কিন সহায়তা বন্ধ হলে চীনের প্রভাব ‘বাড়তে পারে’ – The Finance BD
 ঢাকা     শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন

মার্কিন সহায়তা বন্ধ হলে চীনের প্রভাব ‘বাড়তে পারে’

  • ১০/০২/২০২৫

বিশ্বের সবচেয়ে বড় দাতা রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করেই উন্নয়ন সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে৷ ফলে বাংলাদেশের মতো সহায়তা প্রয়োজন এমন দেশগুলো চীনের দ্বারস্থ হতে পারে৷
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের উন্নয়ন সহায়তা বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তের কারণে বিশ্বের ১৩০টির মতো দেশে মার্কিন অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে৷ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এবং উন্নয়নকর্মীদের উপর এর প্রভাব নাটকীয়৷

ট্রাম্পের অভিযোগ হচ্ছে ইউএসএআইডির মাধ্যমে অর্থের অপচয় হচ্ছে৷ তিনি বৃহস্পতিবার ‘ট্রুথ স্যোশাল’ প্লাটফর্মে লিখেছেন যে, ‘‘মনে হচ্ছে কোটি কোটি ডলার ইউএসএইডে চুরি হয়েছে৷” তিনি অবশ্য তার এই বক্তব্যের পক্ষে কোনো যুক্তি দেননি৷

ইন্দো-প্যাসিফিকের প্রতিদ্বন্দ্বিরা

ট্রাম্পবিরোধী মার্কিন রাজনীতিবিদরা ইতোমধ্যে অভিযোগ করেছেন যে ক্ষুধা, রোগবালাই আর সংঘাতের বিপরীতে লড়াইকে ঝুঁকিতে ফেলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই সিদ্ধান্ত৷ নিউজার্সির ডেমোক্রেটিক সিনেটর এন্ডি কিম মার্কিন সংবাদসংস্থা সিএনএনকে বলেন, ‘‘এটা দানের বিষয় না৷ এটা আমাদের বিষয়৷ চীনের অর্থ এবং অর্থনীতি বিষয়ক প্রভাবের বিপরীতে লড়াইয়ে ইউএসএআইডি আমাদের সেরা অস্ত্র৷”

বিশ্বের মধ্যে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় এই দুই পরাশক্তি উন্নয়ন সহায়তা ব্যবহার করে৷ তাদের বৈরিতা ইন্দো-প্যাসিফিকে বেশ স্পষ্ট৷ যেমন, বাংলাদেশ৷ চীনের কাছে কৌশলগতভাবে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ৷ সতের কোটির বেশি মানুষের দেশটি চীনা পণ্যেরও বড় বাজার৷

চীন কী পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন দেশকে সহায়তা হিসেবে দেয় তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে না৷ কিন্তু মার্কিন রাজ্য ভার্জিনিয়ার কলেজ অব উইলিয়াম এন্ড মেরির গবেষকরা ধারনা করেন যে ২০০০ সাল থেকে এখন অবধি বাংলাদেশের ১৩৮টি উন্নয়ন প্রকল্পে ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়ন করেছে চীন৷ এখন অবধি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে৷ শুধু ২০২৪ সালেই বাংলাদেশকে ৩৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা হিসেবে প্রদান করেছে দেশটি৷
‘চীন ভালো বন্ধুও’
বাংলাদেশে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সংগঠন এডিএবির পরিচালক একেএম জসিমউদ্দিন বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ইউএসএইড এবং মার্কিন সরকারের দীর্ঘদিন ধরে খুব ভালো অংশীদার৷” তার সংগঠনের সদস্য একহাজারের বেশি বেসরকারি সংস্থা৷ তিনি বলেন, ‘‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিয়ে আসছে৷”
জসিমউদ্দিন মনে করেন, মার্কিন উন্নয়ন সহায়তা বন্ধ হওয়ায় তার দেশে বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে৷ অনেক কর্মী ছাঁটাই করা হচ্ছে৷ তিনি বলেন, ‘‘এটা আমাদের জন্য এখন এক বড় সমস্যা৷ এরফলে বাংলাদেশের সুশীল সমাজ দুর্বল হয়ে পড়বে৷ সামাজিক অস্থিরতা হতে পারে এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও দারিদ্রতা বাড়বে৷”
জসিম উদ্দিন বলেন, ‘‘আমাদের অর্থায়নে বৈচিত্র আনতে হবে৷ চীন বাংলাদেশের এক ভালো বন্ধু৷” তিনি আশা করেন, এতকাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেসব মানবিক এবং সামাজিক প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে সেগুলোতে এখন চীন অর্থায়ন করবে৷
বড় প্রকল্পের দিকে নজর চীনের
যদিও ইউএসএআইডি মূলত স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে কাজ করে, ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত চায়না এইড মূলত ঋণ এবং বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পে মনোযোগ দেয়৷ তবে দুই সংস্থারই উদ্দেশ্য একই৷ তাহচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার রাষ্ট্রগুলোতে তাদের সরকারের প্রভাব নিশ্চিত করা৷ ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)’-এর আওতায় চীন বর্তমানে ১৪৫টিরও বেশি রাষ্ট্রকে সেতু, মহাসড়ক এবং বন্দর নির্মাণের মতো যৌথ প্রকল্পের মাধ্যমে সংযুক্ত করতে চাচ্ছে৷
‘মার্কিন নীতির পূর্নমূল্যায়ন’
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতবছর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে যেখানে মার্কিন উন্নয়ন সহায়তাকে ‘স্বার্থপর, অহংকারী, কপট এবং কুৎসিত’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে যে ‘‘নিজেদের স্বার্থে অযৌক্তিকভাবে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্যে” এটি ব্যবহার করা হয়৷ বিদেশে মার্কিন উন্নয়ন সহায়তা শান্তি এবং উন্নয়নের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে চীনের প্রতিবেদনে৷
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের ‘রিইমাজিনিং ইউএস ডিপ্লোমেসি’ প্রকল্পের প্রধান ইভান কুপার মনে করেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের প্রভাব বিস্তারের এই লড়াই শুধু হারজিতের ব্যাপার নয়৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমি মনে করি না যে ইউএসএইড বন্ধ করে অর্থায়ন বাতিল এবং কর্মী ছাঁটাই করলে হঠাৎ করে বিশ্বে মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রভাব ব্যাপক আকারে বেড়ে যাবে৷”
তবে মার্কিন অর্থ স্থগিতের কারণে উন্নয়ন সহায়তাভিত্তিক খাত ধসে যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি৷ ‘‘কিন্তু সেই ঘাটতি পূরণে চীন অগ্রণী ভূমিকা পালনে আগ্রহী হবে না,” যোগ করেন কুপার৷
জার্মানি কি এগিয়ে আসতে পারে?
জার্মানির রক্ষণশীল খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী দল সিডিইউ এবং খ্রিষ্টীয় সামাজিক দল সিএসইউর অর্থনৈতিক সহায়তা এবং উন্নয়ন বিষয় সংসদীয় গ্রুপের মুখপাত্র ফল্কমার ক্লাইন বলেন, ‘‘অ্যামেরিকার প্রত্যাহারের চেয়ে ভালো কিছু চীনের জন্য হতে পারে না৷ বেইজিং তার বিক্রির বাজার নিরাপদ করতে, তার উপর নির্ভরশীলতা তৈরি করতে এবং নানা দেশকে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় নিজের পক্ষে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে৷” ডয়চে ভেলেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘এরফলে চীনের অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর আস্থা ক্ষয়ে যাবে৷” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর জার্মানি বিশ্বের সবচেয়ে বড় দাতা রাষ্ট্র৷ মার্কিন সিদ্ধান্ত জার্মানির উন্নয়ন সহায়তা নীতির উপর কী প্রভাব ফেলতে পারে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আমি মনে করি না আমাদের সঙ্গে সহযোগিতারক্ষেত্রে যে আস্থা রয়েছে তার উপর এর কোনো প্রভাব পড়বে৷ বরং আমরা নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হিসেবে বিবেচিত এবং সেটা অব্যাহত থাকা উচিত৷”
জার্মানির মধ্যবাম সামাজিক গণতন্ত্রী দল এসপিডির উন্নয়নমন্ত্রী স্যোয়েনিয়া শ্যুলৎসে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরবিবিকে একইরকম মতামত জানিয়েছেন৷ তিনি মনে করেন যে এখন যৌথভাবে কী অর্জন করা সম্ভব সেদিকে ইউরোপের নজর দিতে হবে৷ শ্যুলৎসে বলেন, ‘‘আমাদের উন্নয়ন সহায়তা আরো মজবুত করার পরামর্শ নিতে হবে, কমানো যাবে না৷”
ফল্কমার ক্লাইনের রক্ষণশীলরা মতামত জরিপে এগিয়ে আছে৷ আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করলে তিনি আরো আন্তর্জাতিক দায়িত্ব নিতে তার দলকে উদ্বুদ্ধ করবেন৷
‘‘তবে আমরা আমেরিকার সৃষ্ট ঘাটতি কাটাতে পারবো না৷ আমেরিকানরা জার্মানির তুলনায় ছয়গুণ বেশি অর্থ উন্নয়ন সহায়তায় ব্যয় করতো৷ ফলে যে ঘাটতি তৈরি হবে তা আমাদের পক্ষে পূরণ করার ভাবনাটাও অলীক কল্পনা৷”
ইউএসএআইডির বিপুল কর্মী ছাঁটাই
গবেষক ইভান কুপারের শঙ্কা হচ্ছে হঠাৎ করে উন্নয়ন সহায়তা বন্ধ করে দেয়ায় বিশ্বব্যাপী সংঘাত এবং অভিবাসন বেড়ে যেতে পারে৷ তিনি বলেন, ‘‘আমরা দেখেছি অভিবাসনের স্রোত বাড়লে কীভাবে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয় এবং পপুলিজমের উত্থান ঘটে৷ এবং আমি মনে করি মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে৷”
মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইউএসএআইডির দশ হাজার কর্মীর মধ্যে মাত্র কয়েকশত কর্মীকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে৷ এবং এটা নিশ্চিত নয় যে নব্বই দিনের পুনর্মূল্যায়ন শেষে কতগুলো উন্নয়ন প্রকল্প আবার শুরু করতে সম্মত হবে ট্রাম্প প্রশাসন৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যত্র উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে এখন যে উত্তপ্ত বিতর্ক হচ্ছে তা অনেকদিন দেখা যায়নি৷ সূত্র:ডয়চে ভেলে

ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি

ট্যাগঃ

মন্তব্য করুন

Leave a Reply




Contact Us