দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধির ২৫% বহন করবে, যার বেশিরভাগই এখনো কয়লা ও গ্যাসনির্ভর। তাই ইন্দোনেশিয়া ২০টি, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া পরমাণু প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়েছে। ফিলিপাইনের বাতান প্ল্যান্ট চালু করতে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোম্পানি সমীক্ষা চালাচ্ছে। থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারও আগ্রহ দেখিয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একমাত্র পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দাঁড়িয়ে আছে ফিলিপাইনের বাতান শহরে, ম্যানিলা থেকে মাত্র ৪০ মাইল দূরে। ১৯৭০-এর দশকে নির্মিত এই প্রকল্পটি নিরাপত্তা উদ্বেগ ও দুর্নীতির অভিযোগে কখনোই চালু হয়নি। চার দশক পর আজ, জলবায়ু সংকট মোকাবেলা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই অঞ্চলের দেশগুলো আবারো ফিরছে পরমাণু শক্তির দিকে। ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড থেকে মালয়েশিয়া—সবাই চাইছে কয়লা ও গ্যাসনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির পাশাপাশি পরমাণুকে জ্বালানি মিশ্রণের অংশ করতে। দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে জ্বালানির চাহিদা মেটাতে, পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প খোঁজার তাগিদে তারা দেখছে পরমাণুর সম্ভাবনা।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ)-এর নির্বাহী পরিচালক ফেইথ বিয়রলের ভাষ্য, বিশ্বজুড়ে পরমাণু শক্তিতে নতুন যুগের সংকেত মিলছে। ২০২৫ সালে পরমাণু থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ রেকর্ড ছুঁতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বের মোট বিদ্যুতের ১০% আসে পরমাণু শক্তি থেকে, যা আফ্রিকার সমগ্র উৎপাদন ক্ষমতার চেয়েও বেশি। তবে আইইএ সতর্ক করেছে, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন শূন্যে আনতে হলে এই দশকেই নতুন পরমাণু প্রকল্পের গতি বাড়াতে হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধির ২৫% বহন করবে, যার বেশিরভাগই এখনো কয়লা ও গ্যাসনির্ভর। তাই ইন্দোনেশিয়া ২০টি, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া পরমাণু প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়েছে। ফিলিপাইনের বাতান প্ল্যান্ট চালু করতে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোম্পানি সমীক্ষা চালাচ্ছে। থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারও আগ্রহ দেখিয়েছে।
কিন্তু চ্যালেঞ্জ কম নয়। একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ, দীর্ঘ সময় ও জটিল নিয়মকানুনের পাশাপাশি রয়েছে জনমনে ভয়। ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল ও ২০১১ সালের ফুকুশিমা দুর্ঘটনা এই অঞ্চলের দেশগুলোকে সতর্ক করেছে। থাইল্যান্ড ২০১১ সালে পরমাণু পরিকল্পনা স্থগিত করেছিল। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ সরাসরি বলেছিলেন, পরমাণু বিপর্যয়ের ঝুঁকি আমরা নিতে পারব না।
অর্থায়নও বড় বাধা। একটি বড় পরমাণু চুল্লি নির্মাণে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ। ভিয়েতনাম ২০১৬ সালে রাশিয়ার সাথে ১৮ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প স্থগিত করে। বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান সরাসরি পরমাণু প্রকল্পে তহবিল দেয় না। তাদের এক মুখপাত্র সম্প্রতি এপিকে বলেন, “আমরা সদস্য দেশগুলোর সাথে আলোচনা করছি, কিন্তু পরমাণু তহবিলের বিষয়টি তাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।”
তবে গত বছর নিউইয়র্ক ক্লাইমেট উইকে ১৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ২০৫০ সালের মধ্যে পরমাণু ক্ষমতা তিনগুণ করার লক্ষ্য সমর্থন করেছে। বিশ্ব পরমাণু সংস্থার হেনরি প্রেস্টনের মতে, নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী হলে বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসবেন।
প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আশার আলো দেখাচ্ছে। ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) নামে নতুন প্রজন্মের চুল্লি নির্মাণখরচ ও সময় কম বলে দাবি করছে কোম্পানিগুলো। কিন্তু জাকার্তাভিত্তিক এনার্জি শিফট ইনস্টিটিউটের পুত্র আদিগুনা সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, এসএমআর-এর বাণিজ্যিক সাফল্য প্রমাণিত হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম এসএমআর প্রকল্পের খরচ প্রতি মেগাওয়াটে ৫৫ ডলার থেকে বেড়ে ৮৯ ডলারে পৌঁছায়, শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য আরেক বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ জনবলের অভাব। ভিয়েতনাম অনুমান করছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি পুনরায় চালু করতে ২ হাজার ৪০০ প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানী প্রয়োজন। দেশটির শিল্পমন্ত্রী নিউয়েন হং ডিয়েনের কথায়, এটি শুধু প্রকল্প নয়, ভবিষ্যতের জন্য একটি সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার প্রশ্ন।
ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি
ট্যাগঃ
মন্তব্য করুন