ইউরোপের মন্থর প্রবৃদ্ধির মাঝে সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ব্যবসা ও সরবরাহ চেইনে ভূমিকা রাখা জ্বালানি এবং ডিজিটাল সংযোগগুলো।
ইউরোপের মন্থর প্রবৃদ্ধির মাঝে সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ব্যবসা ও সরবরাহ চেইনে ভূমিকা রাখা জ্বালানি এবং ডিজিটাল সংযোগগুলো। সম্প্রতি অঞ্চলটির সমুদ্রতল বা আন্ডারসি অবকাঠামোকে অ্যাকিলিস হিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে। এ সপ্তাহের শুরুতে সুইডেন ও লাটভিয়ার মধ্যে ডাটা পরিবহনের একটি কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লাটভিয়া দাবি করেছে বাহ্যিক কোনো শক্তির কারণে এমনটা হয়েছে। এ ঘটনায় ইউরোপের সমুদ্রতলের অবকাঠামো নিয়ে নতুন আশঙ্কা জেগে উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি পরিকল্পিত হামলা ইউরোপের যোগাযোগ ব্যবস্থা পঙ্গু করে দিতে পারে, যা কিনা রাতারাতি চিকিৎসা ব্যবস্থা, আইন-শৃঙ্খলা তৎপরতা ও জরুরি পরিষেবাগুলোর ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
এর আগে বাল্টিক সাগরের নিচে প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী পাইপলাইন এবং বিদ্যুৎ ও ডাটা পরিবহনকারী কেবলের মতো ইউরোপীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা ক্রমে বেড়ে চলায় অন্তর্ঘাতমূলক সন্দেহে একাধিক তদন্ত পরিচালনা করেছেন ইউরোপীয় কর্মকর্তারা। অনেকে প্রকাশ্যে মস্কোর দিকে অভিযোগের আঙুল তুললেও রাশিয়া তা অস্বীকার করে আসছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষণা সংস্থা কার্নেগি অ্যানডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো সোফিয়া বেচের মতে, যদি রাশিয়ার কাজ হয়, তবে তা ইউরোপের অবকাঠামোয় বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি কৌশল হতে পারে, যা জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক ও অস্থিতিশীলতা তৈরির জন্য ব্যবহার হতে পারে।
ঘটনাগুলোয় যে পক্ষই থাকুক এতে ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। যাকে বিশেষজ্ঞরা নতুন এক নিরাপত্তার সীমারেখা বলে অভিহিত করেছেন। ব্রুগেল থিংক ট্যাংকের সিনিয়র ফেলো জর্জ জাখমানের ভাষ্যে, ইউরোপ এ ধরনের অবকাঠামোর ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল এবং বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’
সমুদ্রতলের সংগঠিত সাম্প্রতিক আলোচনা তোলা প্রথম ঘটনা ২০২২ সালের নর্ড স্ট্রিম বিস্ফোরণ। ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় রুশ আক্রমণ শুরুর কয়েক মাস পর একাধিক বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নর্ড স্ট্রিম ওয়ান ও নর্ড স্ট্রিম টু পাইপলাইন। রাশিয়া থেকে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহে এ পাইপলাইন ব্যবহার হয়ে আসছিল। পরে তদন্তকারীরা একে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড বলে উল্লেখ করেন।
২০২৩ সালের শেষ দিকে বেশকিছু ঘটনা ইউরোপের সাগরতলের অবকাঠামোর ঝুঁকি নতুন করে সামনে আনে। ওই বছরের অক্টোবরে ফিনল্যান্ড ও এস্তোনিয়ার মধ্যকার গ্যাস পাইপলাইন বাল্টিককানেক্টরে বড় ধরনের ছিদ্র ধরা পড়ে। পরের মাসে সুইডেন ও লিথুয়ানিয়া এবং ফিনল্যান্ড ও জার্মানির মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী দুটি সামুদ্রিক ইন্টারনেট কেবল কাটা পড়ে। এ বিষয়ে এস্তোনিয়া ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা জানান, তাৎক্ষণিকভাবে এ ঘটনা ইচ্ছাকৃত বলে সন্দেহ সৃষ্টি করে। দুর্বৃত্তদের কারণে হাইব্রিড যুদ্ধের হুমকির সম্মুখীন হয়েছে ইউরোপীয় নিরাপত্তা।
২০২৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর ফিনল্যান্ড ও এস্তোনিয়ার মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী একটি কেবল অকেজো হয়ে যায়। পরদিন ফিনিশ কর্তৃপক্ষ ইগল এস নামে একটি রুশ তেল ট্যাংকার আটক করে। তাদের সন্দেহ, জাহাজটি নোঙর টেনে কেবল কেটে ফেলেছিল।
প্রতিটি ঘটনার জন্য সরাসরি দায় নির্ধারণ করা কঠিন। কিন্তু ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষের দিকে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। গত সেপ্টেম্বরে মার্কিন গোয়েন্দারা জানান, বাল্টিক অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে রাশিয়া। এ অঞ্চলে শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছদ্মবেশী জাহাজের উপস্থিতি বেড়েছে। মূলত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত পুরনো ট্যাংকারের নেটওয়ার্ক হলো শ্যাডো ফ্লিট।
তবে এসব ঘটনায় মস্কো জড়িত, এমন শক্ত প্রমাণ পাওয়া কঠিন। বাল্টিক সাগরে ২০২৩ সালের নভেম্বরের ঘটনার প্রাথমিক মূল্যায়নসংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছিলেন, দুটি ইন্টারনেট কেবল কাটার সঙ্গে কোনো ঘৃণ্য কার্যকলাপের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের নৌবাহিনী ও সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক সিনিয়র ফেলো নিক চাইল্ডস বলেন, বাল্টিক খুব ঘনবসতিপূর্ণ ও জনাকীর্ণ জলপথ। ফলে সন্দেহজনক কার্যকলাপ শনাক্ত ও প্রমাণ করা উভয়ই কঠিন হয়ে পড়ে। তবু কিছু ঘটনার জন্য”অনেক আঙুল রাশিয়ার দিকেই নির্দেশ করছে।’
লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী দোভিলে সাকালিয়েনের মতে, এক-দুবার যদি পাইপলাইন বা কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তা দুর্ঘটনা ও কাকতালীয় হতে পারে। এর বেশি ঘটনা স্বভাবতই সন্দেহজনক।
ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমাদের সঙ্গে রাশিয়ার বিরোধের সূচনা যুদ্ধের বেশ আগে। তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা মস্কোর বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে আসছিল। কিন্তু জ্বালানির জন্য ইউরোপ গভীরভাবে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে জ্বালানি পাইপলাইন ক্ষতির শিকার হয়েছে। সমুদ্রতলের রহস্যজনক এসব ঘটনায় ইউরোপ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে ন্যাটো সাব-সি ড্রোন মোতায়েনের পাশাপাশি নৌ ও বিমান বাহিনীকে আরো শক্তিশালী করছে। এছাড়া কেবল ও পাইপলাইনের ওপর নজরদারি বাড়ানোর জন্য নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। পাশাপাশি ইইউ দেশগুলো যৌথভাবে সন্দেহজনক ঘটনার তদন্ত করছে। গত সপ্তাহে লন্ডনে রুশ দূতাবাস এক বিবৃতিতে বলেছে, রাশিয়ার হুমকি নামক কাল্পনিক অজুহাত ব্যবহার করে ন্যাটো বাল্টিক অঞ্চলে তাদের নৌ ও বিমান বাহিনীর উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।
ন্যাটো সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটে বলেন, আমাদের অবকাঠামো রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি জ্বালানি সরবরাহ ও ইন্টারনেট ট্রাফিকের জন্য জরুরি।’
এমন পরিস্থিতিতে অবকাঠামোর নিরাপত্তা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহের ক্ষেত্রে একমুখী নির্ভরতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে সামুদ্রিক অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বড় নিরাপত্তার হুমকি তৈরি করছে।
ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি
ট্যাগঃ
মন্তব্য করুন