গাজা যুদ্ধের কারণে ইসরায়েলি অস্ত্র নির্মাতারা ২০২৩ সালের রেকর্ড পরিমাণ আয় করেছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০০ অস্ত্র নির্মাতার ওপর প্রকাশিত গবেষণায় এ তথ্য দিয়েছে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই)। সংস্থাটি বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্ত্র বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে ইসরায়েল এবং এখানকার কোম্পানিগুলোর আয় অভূতপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে সামগ্রিক অর্থে অস্ত্রের বাজার শাসন করছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর রয়েছে চীন ও যুক্তরাজ্য।
প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বের শীর্ষ ১০০ অস্ত্র কোম্পানি ২০২৩ সালে আবার আয় বৃদ্ধির ধারায় ফিরে এসেছে। ২০২২ সালে কোম্পানিগুলোর বিক্রিতে পতন দেখা দেয়। এবার প্রায় ৭৫ শতাংশ কোম্পানির আয় বেড়েছে।
এসআইপিআরআইয়ের গবেষক লোরেঞ্জো স্কারাজাটো বলেন, ‘২০২৩ সালে অস্ত্র বিক্রিতে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। এ প্রবণতা ২০২৪ সালেও অব্যাহত থাকবে।’ তিনি আরো জানান, উল্লিখিত আয় এখনো উচ্চ চাহিদার পুরোপুরি প্রতিফলন নয়। অনেক কোম্পানি নতুন কর্মী নিয়োগ করছে, যা ভবিষ্যতে বিক্রির প্রতি তাদের আস্থার প্রতিফলন। প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩ সালে আগের বছরের তুলনায় ইসরায়েলি অস্ত্র নির্মাতাদের সম্মিলিত আয় ১৫ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৩৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা অস্ত্র খাতের আয়ের হিসাবে বিশ্বে অষ্টম অবস্থান, মোট ৬৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার বিক্রির ২ দশমিক ২ শতাংশ। এসআইপিআরআই জানিয়েছে, অস্ত্র শিল্পে ২০২৩ সালে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট এ প্রতিবেদনে সামরিক পণ্য ও পরিষেবা বিক্রি বাবদ স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক আয়কে আমলে নিয়েছে। শীর্ষ ১০০ অস্ত্র বিক্রেতা কোম্পানির তালিকায় ২৭তম অবস্থানে রয়েছে ইসরায়েলের এলবিট সিস্টেমস। কোম্পানিটি ২০২৩ সালে ৫৪০ কোটি ডলার আয় করেছে। ওই বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বরের মধ্যে গাজায় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে ৯০ কোটি ডলারের চুক্তি করে এলবিট সিস্টেমস।
৩৪তম অবস্থানে থাকা ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের (আইএআই) আয় আগের বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৪৫০ কোটি ডলার। অন্যদিকে ৪২তম অবস্থানে থাকা রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের আয় ১৬ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৩৭০ কোটি ডলার। উভয় সংস্থা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর জন্য নতুন অস্ত্র ও পরিষেবা উৎপাদন বাড়ানোর ফল পাচ্ছে। রাফায়েল ২০টি ন্যাটো দেশের গ্রাহককে পরিষেবা দিয়ে থাকে এবং এটি ৩০টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে কাজ করছে। অ্যারোস্পেস, এলবিট ও অন্যান্য ইসরায়েলি কোম্পানিও আন্তর্জাতিক পরিসরে বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ।
এসআইপিআরআইয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক দিয়েগো ডা সিলভা বলেন, ‘শীর্ষ ১০০ অস্ত্র নির্মাতার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের কোম্পানিগুলো তাদের অস্ত্র বিক্রিতে আয় অভূতপূর্ব পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এ বৃদ্ধি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।’ গত অক্টোবরে গাজার যুদ্ধ দ্বিতীয় বছরে পা দিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ইসরায়েলি অস্ত্র নির্মাতাদের নতুন ক্রয়াদেশের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অবশ্য এসআইপিআরআইয়ের রিপোর্টে ইরান ও লেবাননের সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাতের সম্ভাব্য প্রভাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
অস্ত্র নির্মাণে বিশ্বের শীর্ষ দেশ হিসেবে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র আয় করেছে ৩১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার, যা সামগ্রিক অস্ত্র বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেক। এতে শীর্ষ ৪১টি কোম্পানির আয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের আয় বেড়েছে আগের বছরের তুলনায় আড়াই শতাংশ। তবে এক নম্বরে থাকা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা লকহিড মার্টিনের আয় কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। অবশ্য তৃতীয় বার্ষিক পতন সত্ত্বেও কোম্পানিটি আয় করেছে ৬ হাজার ৮০ কোটি ডলার।
শীর্ষ নয় কোম্পানি নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকা চীনের আয় ১০ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। যুক্তরাজ্য আয় করেছে ৪ হাজার ৭৭০ কোটি ডলার। দেশ দুটির বাজার হিস্যা যথাক্রমে ১৬ ও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া ইউরোপের বৃহত্তর ২৭টি কোম্পানির আয় দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ১৯ হাজার ৯০০ কোটি ডলার হয়েছে, যা শীর্ষ ১০০টির মোট আয়ের ২১ শতাংশ।
৪ শতাংশ হিস্যা নিয়ে পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে ফ্রান্স ও রাশিয়া। রাশিয়ার দুই কোম্পানি রোস্টেক ও ইউএসসি এ সময় ২ হাজার ৫৫০ কোটি ডলার আয় করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধোর প্রেক্ষাপটে দেশটির কোম্পানিগুলোর অস্ত্র বাবদ আয় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
এশিয়া ও ওশেনিয়ার ২৩টি কোম্পানির আয় গত বছর ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের কোম্পানিগুলো এ অঞ্চলে নেতৃত্ব দিচ্ছে। যাদের আয় যথাক্রমে ১ হাজার ১০০ কোটি ও ১ হাজার কোটি ডলার।
অন্যদিকে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ১ হাজার ৯৬০ কোটি ডলার আয় করেছে। এর মধ্যে তুরস্কের ড্রোন নির্মাতা কোম্পানি বায়কার ১৯০ কোটি ডলার আয় করেছে, যার ৯০ শতাংশ রফতানির মাধ্যমে এসেছে।
২০০৯ সাল থেকে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বৈশ্বিক অস্ত্র বাণিজ্যের প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। গত বছর টানা নবম বছরে এ খাতে খরচ বেড়ে হয়েছে রেকর্ড ২ দশমিক ৪৪৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এসআইপিআরআইয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক নান তিয়ানের মতে, ‘অস্ত্র বাণিজ্যের এ উত্থান হলো বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবনতির প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া। কারণ রাষ্ট্রগুলো সামরিক শক্তিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।’
খবর দ্য ন্যাশনাল ও আনাদোলু।
ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি
ট্যাগঃ
মন্তব্য করুন