যুক্তরাজ্যের অধীনে থাকা স্বশাসিত অফশোর অঞ্চলগুলো বিশ্বব্যাপী পাচার হওয়া অর্থের অন্যতম গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। যদিও লন্ডনের মতো মূল ভূখণ্ডের শহরগুলোও এ অভিযোগের বাইরে নয়। এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম বন্ধে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে অফশোর অঞ্চলে কোম্পানির মালিকানা নিবন্ধনে স্বচ্ছতা বাড়াতে কঠোরতা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।
রাজনৈতিক পক্ষগুলোর দাবি ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস (বিভিআই), কেইম্যান আইল্যান্ডস বা ব্রিটিশরাজের অধীনে থাকা যুক্তরাজ্যের অফশোর আর্থিক কেন্দ্রগুলোয় বৈশ্বিক নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বচ্ছ মালিকানা নিবন্ধনে যেতে হবে। এজন্য পাবলিক রেজিস্টার বাধ্যতামূলক হতে হবে, যেখানে যে কেউ তথ্য পেতে পারে। এতে অর্থ পাচার ও কর ফাঁকি ঠেকাতে কোম্পানির প্রকৃত মালিকদের শনাক্ত করতে পারবে সরকারি ও এ সম্পর্কিত বেসরকারি সংস্থাগুলো।
আগামীকাল লন্ডনে বিভিআই ও কেইম্যান আইল্যান্ডসসহ অন্যান্য অঞ্চলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক শীর্ষ সম্মেলন শুরু হবে। এর আগে অর্থ পাচার বিষয়ে লেবার পার্টির এমপি ডেম ম্যাগারেট হজ ও কনজারভেটিভ এমপি অ্যান্ড্রু মিচেল যথাযথ পদক্ষেপ নিতে সরকারের বিলম্ব ও একে-অন্যের প্রতি দোষারোপের সমালোচনা করেছেন। এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য গার্ডিয়ান।
সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহের উল্লেখযোগ্য দিক হলো অফশোর আর্থিক কেন্দ্রগুলোর দুর্নীতি প্রতিরোধে লবিংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে লেবার পার্টি। তারা বলছে, করপোরেট স্বচ্ছতার উদ্যোগকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এটি শুধু দুর্নীতি রোধে নয়, যুক্তরাজ্যের আর্থিক ব্যবস্থায় জনগণের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করবে। তবে এ পদক্ষেপ পুরোপুরি বাস্তবায়ন একটি জটিল প্রক্রিয়া। কারণ কিছু অঞ্চল নিজেদের সংবিধানিক বা আইনি চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে এর বিরোধিতা করছে।
দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয়তে দুই এমপি অভিযোগ তুলেছেন, বিদেশী অঞ্চল এবং জার্সি ও আইল অব ম্যানের মতো ব্রিটিশরাজের অধীনে থাকা অঞ্চলে অর্থ পাচার এবং অন্যান্য বেআইনি লেনদেন প্রতিরোধে যে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, সেগুলো দুর্বল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
হজ ও মিচেল বলেন, “আমরা জানি, এ অঞ্চলগুলো অপরাধী ও কর ফাঁকি দেয়া ব্যক্তিদের ‘কালো টাকা’ লুকাতে সাহায্য করে।” তারা আরো যোগ করেছেন, ‘কালো টাকা দুর্নীতি, অপরাধ ও সংঘাতের জন্য দায়ী। এটি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক ক্ষতি করে, গুরুতর ও সংগঠিত অপরাধে সহায়তা করে এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থার প্রয়োজনীয় সম্পদ নষ্ট করে।’
তাদের মন্তব্য পাবলিক রেজিস্টার ও এর পর্যালোচনা হলো বেআইনি আর্থিক লেনদেনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর উপায়। হজ ও মিচেল দাবি করেছেন, ২০২৩ সালের মধ্যে পাবলিক রেজিস্টার বাস্তবায়নের কথা থাকলেও কিছু অফশোর আর্থিক কেন্দ্র তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।
এ বিতর্কের অন্যতম বিষয় কোন কোন কোম্পানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে ও তাদের অবস্থা কি সবার জন্য উন্মুক্ত হবে, নাকি ‘বৈধ স্বার্থ’ আছে এমন ব্যক্তিরা তা দেখতে পারবেন। ‘বৈধ স্বার্থ’ রয়েছে বলতে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করে, এমন অ্যাক্টিভিস্ট ও অন্যান্য সংস্থাকে বোঝানো হয়েছে। কিছু বিদেশী অঞ্চল পূর্ণ উন্মুক্ত রেজিস্টারের বিরোধিতা করছে। তাদের সঙ্গে কাজ করা ব্রিটিশ লবিস্টরা চাইছে সরকার যেন সমঝোতার মাধ্যমে তথ্যপ্রাপ্তি সীমাবদ্ধ করে।
সম্প্রতি এক অনলাইন ব্রিফিংয়ে অফশোরে নিবন্ধিত কোম্পানিগুলোর স্বার্থ দেখভাল করে, এমন সংস্থা আইএফসি ফোরাম অংশ নিয়েছে। সেখানে আইনজীবী ও লবি সদস্যরা লেবার এমপিদের ‘জানাশোনার’ পরিধি বাড়ানোর কথা বলেন। এর মধ্যে আইনজীবী অলিভার কুপার জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যাম্বি ও অফশোর অঞ্চল বিষয়ক মন্ত্রী স্টিফেন ডাউটি সরকার অফশোর আর্থিক কেন্দ্রগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল। তবে স্টিফেন ডাউটি এ দাবি অস্বীকার করে বলেছেন, বৈধ স্বার্থের বিবেচনাগুলো অবশ্যই উচ্চ মানের হতে হবে এবং এটি একটি অন্তর্র্বতী পদক্ষেপ হতে হবে, যাতে জনসাধারণের পূর্ণ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যায়।
লবিস্ট মিচেল কোহেন দাবি করেছেন, অফশোর কেন্দ্রগুলোকে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে এবং ‘নেগেটিভ ব্র্যান্ডিং’ দূর করতে হবে। তার মতে, ব্রিটিশ অর্থ মন্ত্রণালয় পূর্ণ পাবলিক রেজিস্টার বাস্তবায়ন না করার পক্ষে সহানুভূতিশীল হতেও পারে। তবে পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ব্রিটিশ সরকার পূর্ণ পাবলিক রেজিস্টারের জন্য কঠোরভাবে কাজ করছে।
হজ ও মিচেল আরো বলেন, ‘যদি বিদেশী অঞ্চলগুলো পার্লামেন্টের মতামত অগ্রাহ্য করে, তবে আমাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।’ এর আগে সরকারকে ‘অর্ডার ইন কাউন্সিল’ জারি করতে এবং বিদেশী অঞ্চলগুলোকে বাধ্য করতে বলেছিলেন হজ। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ সংবিধানিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
কেইম্যান আইল্যান্ডসের এক মুখপাত্র পাল্টা দাবি করেছেন, ‘এমন কোনো প্রমাণ নেই, যা কেইম্যান আইল্যান্ডসের ক্ষেত্রে বেআইনি আর্থিক লেনদেন বা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন প্রমাণিত করে।’
চলতি বছর ক্ষমতায় আসা লেবার পার্টির প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে অর্থ পাচার বন্ধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তারা প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য অফশোর অঞ্চলে আর্থিক অপরাধ রোধে কাজ করবে এবং কোম্পানির মালিকানার বিষয়ে স্বচ্ছতা এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কিছু অঞ্চল আইনগত বা সার্বভৌমত্বের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। যেমন চলতি বছরের মধ্যে জিব্রাল্টার ও অন্য কিছু অঞ্চলে এ ধরনের পাবলিক রেজিস্টার চালুর প্রস্তুতি চলছে।
ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি
ট্যাগঃ
মন্তব্য করুন