রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতেই ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয় রাশিয়া। সংকট সামাল দিতে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি পণ্যটি আমদানি করে মজুদাগার পূর্ণ করতে থাকে ইউরোপের দেশগুলো। এমনকি অঞ্চলটির রাজনীতিবিদরাও ঘোষণা দেন, গ্যাস সংকটের অবসান ঘটেছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও ইউরোপে গ্যাস সংকট এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
নরওয়ের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি ইকুইনর গত মঙ্গলবার একটি উৎপাদন কেন্দ্রে ধোঁয়া দেখা যাওয়ায় উৎপাদন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। এ খবর প্রকাশের পর গত সপ্তাহে ইউরোপের প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজার আদর্শ ডাচ টাইটেল ট্রান্সফার ফ্যাসিলিটির (টিটিএফ) দাম এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছে। গত শুক্রবার ডাচ টিটিএফের দাম প্রতি মেগাওয়াট-আওয়ার ৪৩ দশমিক ৬৮ ইউরোয় পৌঁছে, যা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে ইউরোপের গ্যাস মজুদাগারগুলো পূর্ণ। অর্থাৎ বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রয়েছে। অথচ একটি উৎপাদন কেন্দ্রে বিঘ্ন ঘটার খবরে গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। তাছাড়া শীতকাল সামনে রেখে চাহিদা কিছুদিনের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছবে। সব মিলিয়ে সামনের দিনে গ্যাসের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে নরওয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারী। এটি ইইউর গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করে। উৎপাদন স্থগিতের খবর দেয়ার সময় ইকুইনর জানিয়েছিল, এটি রফতানিতে প্রভাব ফেলবে না। তা সত্ত্বেও ইউরোপে গ্যাসের দাম বেড়ে যায়। ইউরোপের দেশগুলো জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এ লক্ষ্যে অঞ্চলটির গ্যাস আমদানিকারকরা বছরের শুরু থেকে মজুদ বাড়ানো শুরু করে। শীতকাল শুরু হওয়ার আগেই পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিতে তারা সফলও হয়েছে। বর্তমানে ইইউর গ্যাস মজুদাগারগুলো ৯৫ শতাংশ পূর্ণ। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার শীতকালে গত দুই বছরের তুলনায় বেশি ঠাণ্ডা পড়লে এ মজুদ পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। তখন অঞ্চলটিতে গ্যাস সংকট দেখা দিতে পারে।
প্রাথমিক পূর্বাভাসেও এমনটা ঘটার আশঙ্কা দেখা গেছে। এতে বলা হয়, ইইউ ২০২২-২৩ সালের শীতকাল কোনো সংকট ছাড়া শেষ করতে পেরেছিল, কারণ সে বছর শীতকালে তুলনামূলক কম ঠাণ্ডা পড়েছিল। তবে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য শুধু ভাগ্যের ওপর নির্ভর করা উচিত হবে না।
গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ‘স্টেট অব দ্য এনার্জি ইউনিয়ন রিপোর্টে’ও বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, ইইউতে আমদানীকৃত মোট গ্যাসের মধ্যে রাশিয়ার হিস্যা ২০২১ সালে ছিল ৪৫ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুনে তা কমে ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে। বিপরীতে নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বস্ত অংশীদারদের থেকে আমদানি বেড়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলেন, পরিমাণ কমলেও রাশিয়া এখনো ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি গ্যাস সরবরাহ করে। যদিও ইউরোপীয় রাজনীতিবিদরা দেশটি থেকে আমদানি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন।
তাদের মতে, সাম্প্রতিক মূল্য বৃদ্ধির ঘটনা একটি সতর্কবার্তা। সম্প্রতি য্ক্তুরাষ্ট্রে নতুন এলএনজি রফতানি টার্মিনাল স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা আদালত স্থগিত করে দিয়েছেন। কিন্তু নতুন টার্মিনাল নির্মাণে সময় প্রয়োজন। তাছাড়া ইউক্রেন হয়ে রাশিয়া থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমের গ্যাস সরবরাহের কোনো সম্ভাবনা নেই। অথচ ইউরোপে এখন গ্যাসের প্রয়োজন।
সম্প্রতি রাশিয়ার গ্যাসের বিকল্প সরবরাহ হিসেবে আজারবাইজানের সঙ্গে আলোচনার কথা জানা গেছে। তবে আজারবাইজানের রফতানি সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ খবর প্রকাশের পর গ্যাসের দাম কমলেও তা স্থায়ী হয়নি।
এইচএসবিসির ইউরোপীয় জ্বালানি তেল ও গ্যাস গবেষণার প্রধান কিম ফুস্টিয়ার বলেন, ‘এ পরিস্থিতি নির্দেশ করে যে আগামী বছর ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ ২০২৪-এর তুলনায় ভালো হবে না। বরং আরো খারাপ হতে পারে।’ (খবরঃ অয়েলপ্রাইস)।
ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি
ট্যাগঃ
মন্তব্য করুন