উচ্চ সুদহার ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কয়েক বছর ধরে ব্যবসায়িক খাতগুলোয় নানা ধরনের জটিলতা জারি রেখেছে। এর মাধ্যমে কম-বেশি প্রভাবিত হচ্ছে ঋণদাতা পক্ষগুলো, যার অন্যতম হলো প্রাইভেট ডেট বা ব্যক্তি খাতের ঋণদাতারা। এশিয়ার আর্থিক বাজারে এক সময়ে ব্যক্তি খাতের ঋণ প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা আবার শ্লথ হয়ে এসেছে।
অলটারনেটিভ বা বিকল্প বাজার তথ্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠান প্রিকিনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩ সালে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে ব্যক্তি খাতের ঋণ তহবিল থেকে মূলধনের জোগান ৫০০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। ২০২১ সালে এ খাত শীর্ষ সময় পার করে। ওই সময় বাজারে বিনিয়োগ হয়েছে ১ হাজার ৫১০ কোটি ডলার।
এশিয়া প্যাসিফিককে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের জন্য গঠিত তহবিল চলতি বছরে আরো সংকুচিত হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রিকিন। পরিসংখ্যান অনুসারে, বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) এর আকার ছিল ১১০ কোটি ডলার। ২০২১ সালে এ ধরনের তহবিলের সংখ্যা ছিল ৫১। চলতি বছরের প্রথমার্ধে এর পরিমাণ ছিল ১২টি।
প্রিকিনের প্রতিবেদনটির প্রধান লেখক হর্ষ নারায়ণ। সামগ্রিক পরিস্থিতির নিরিখে তিনি জানান, মূলধন সংগ্রহের সমস্যা শুধু এখানে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রাইভেট ইকুইটি, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
২০২২ সালের মার্চের দিকে বৈশ্বিক পরিসরে আর্থিক কঠোরতা বাড়তে থাকে। এর আগে সীমিত ডিফল্ট ঝুঁকিসহ সহজেই ঋণ পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে প্রধান অর্থনীতিগুলোয়ই দুই দশকেরও বেশি সময় সর্বোচ্চ সুদহার বিরাজ করছে ও একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি মন্থরতা সমস্যা আকারে রয়েছে। তাই বিনিয়োগের খাত বাছাই ও ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা খুবই সতর্ক রয়েছেনে বলে মত হর্ষ নারায়ণের। “ক্ষতি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে কী কী সুরক্ষা নীতি ও চুক্তির শর্ত রয়েছে, এ বিষয়গুলো বেশি করে ভাবছেন বিনিয়োগকারীরা।
বিশ্বের অন্য অঞ্চলের তুলনায় এশিয়া-প্যাসিফিকে ব্যক্তি খাতের ঋণ তহবিলের বিকাশ তুলনামূলক নতুন, পাঁচ বছর বা এর একটু বেশি। সে হিসাবে এখানে বিতরণকৃত ঋণ এখনো মন্দা ও পুনরুদ্ধারের পুরো চক্র পূরণ করেনি। এ কারণে খাতটির বিকাশে ফান্ড ম্যানেজার বা ব্যবস্থাপকদের পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে। তাদের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে হর্ষ নারায়ণ বলেন, ‘কীভাবে তারা উচ্চ সুদহার ও অস্পষ্ট অর্থনৈতিক পরিবেশে ফান্ড পরিচালনা করবেন? যারা এক্ষেত্রে সক্ষমতা দেখিয়েছেন তারা পরবর্তী সময়ে বেশি মূলধন আনতে পেরেছেন।’
প্রিকিনের দেয়া তথ্যানুসারে, বৈশ্বিক প্রাইভেট ডেট বাজারে এশিয়ার হিস্যা ৫ শতাংশ, যা এ অঞ্চলের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ছোট।
ব্যক্তি খাতের ঋণ তহবিল থেকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পায়। তারা সাধারণত প্রথাগত ব্যাংকিং রীতি অনুসরণ করে না এমন ধরনের বিনিয়োগে মনোযোগ দিয়ে থাকে। যেমন লিভারেজড বাইআউট (এলবিও) ও হেজ ফান্ড এবং স্টার্টআপ বা ছোট ও মাঝারি আকারের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে। সাধারণ কম ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রাইভেট ডেট বিতরণ হয়।
এশিয়া অঞ্চলে প্রাইভেট ডেটের সূচনায় বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে ব্ল্যাকস্টোন, বেইন ক্যাপিটাল, অ্যাপেলো বা ব্ল্যাকরকের মতো বৈশ্বিক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোর। সরকারি বন্ডের মতো প্রথাগত স্থির-আয়ের আর্থিক পণ্যের বিকল্প হিসেবে প্রাইভেট ডেটকে জনপ্রিয় করতে চাইছে এসব প্রতিষ্ঠান। কারণ ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির মধ্যে বন্ড এখন আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এ ধরনের বৈশ্বিক সংস্থা এশিয়ার বিনিয়োগকারীদের অন্য বাজারেও ঋণ দেয়ার সুযোগ করে দেয়, যা স্থানীয় অ্যাসেট ম্যানেজারদের জন্য সহজ নয়।
এদিকে প্রাইভেট ডেটের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে সম্প্রতি বিদেশী অ্যাসেট ম্যানেজারদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে জাপান সরকার। এর সূত্র ধরে লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি খাতের ঋণ ব্যবস্থাপক আরেস ম্যানেজমেন্ট এ বছর টোকিওতে অফিস খুলবে। এছাড়া জাপানে পরিষেবা শুরু করতে চাইছে কেকেআর। অবশ্য স্থানীয় কোম্পানিগুলো এ চ্যালেঞ্জের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার এমবিকে পার্টনার, হংকংভিত্তিক পিআইজি ও জাপানের এমসিপি, যা আগে মিজুহো ক্যাপিটাল পার্টনার নামে পরিচিত ছিল। কোম্পানিগুলো ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ার প্রধান বাজারগুলোয় প্রাইভেট ডেট পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে চাইছে।
এরই মধ্যে সিঙ্গাপুরের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল জিআইসি ও টেমাসেক প্রাইভেট ডেট খাতে নিজস্ব পোর্টফোলিও তৈরি করেছে। এছাড়া রয়েছে কোরিয়া ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন ও জাপানের গভর্মেন্ট পেনশন ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (জিপিআইএফ) মতো সরকারি সংস্থা।
গত ফেব্রুয়ারিতে জাপানের নোমুরা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট জানিয়েছিল, ২০২৫ সালের মার্চ নাগাদ ব্যক্তি খাতের ঋণ তহবিল চালু করবে। একই মাসে মার্কিন প্রাইভেট ডেট ম্যানেজার ক্যানিয়ন পার্টনারদের অংশীদারত্ব কিনে নেয় দাই-ইচি লাইফ। এছাড়া এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ফ্যামিলি অফিসগুলোও এ ধরনের ঋণের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী বলে জানান প্রিকিনের হর্ষ নারায়ণ।(সূত্রঃ নিক্কেই এশিয়া)
ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি
ট্যাগঃ
মন্তব্য করুন