থাইল্যান্ডে বাজার সম্প্রসারণ করছে মিয়ানমারের অভিবাসী উদ্যোক্তা ও ভোক্তারা – The Finance BD
 ঢাকা     শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ০২:৩১ পূর্বাহ্ন

থাইল্যান্ডে বাজার সম্প্রসারণ করছে মিয়ানমারের অভিবাসী উদ্যোক্তা ও ভোক্তারা

  • ১১/০৮/২০২৪

দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ, কঠোর সেনা শাসন ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ভুগছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তরুণদের জন্য প্রযোজ্য বাধ্যতামূলক সামরিক কাজে অংশগ্রহণের আদেশ। সব মিলিয়ে কয়েক দশকের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা অভিবাসীর সংখ্যা বেড়েছে। যাদের একটি অংশ থাইল্যান্ডে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। আজকাল স্বদেশী অভিবাসীদের চাহিদা মেটাতে থাইল্যান্ডে মিয়ানমারের নাগরিকদের মালিকাধীন মুদি বা রেস্তোরাঁর ব্যবসার পরিধি বাড়ছে।
অভিবাসীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, গত তিন মাসে থাইল্যান্ডে মিয়ানমার থেকে আসা ব্যক্তিরা কয়েক ডজন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, যার মধ্যে মিয়ানমারে চালু ব্যবসার নতুন আউটলেটও রয়েছে।
মিয়ানমারের এক ব্যবসায়ী সম্প্রতি তার মোবাইল ও কম্পিউটারের দোকান ব্যাংককে স্থানান্তর করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি ও অস্থিতিশীল আর্থিক নীতির কারণে মিয়ানমারের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে। অন্যদিকে পণ্য ও পরিষেবার জন্য থাইল্যান্ড অনেক বেশি স্থিতিশীল।’
থাইল্যান্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ও মিয়ানমারের সঙ্গে এর সরাসরি সীমান্ত রয়েছে। এ কারণে ব্যবসা স্থানান্তর ও বাজার সম্প্রসারণের চাহিদা লুফে নিচ্ছেন মিয়ানমারের ব্যবসায়ীরা।
প্রায় চার দশক ধরে খুচরা পর্যায়ে ঘড়ি বিক্রি করে আসছেন চেরি ও, মিয়ানমারে তার ৩৮টি স্টোর রয়েছে। নতুন চাহিদা বিবেচনায় রেখে সম্প্রতি থাইল্যান্ডে দোকান খুলেছেন তিনি।
ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশনকারী হিসেবে মিয়ানমারে বেশ পরিচিত রেস্তোরাঁ চেইন খাইং খাইং কিয়াও। দুই দশক ধরে ১০টি আউটলেট নিয়ে মিয়ানমারে ব্যবসা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রথম ও গত মার্চে থাইল্যান্ডে দ্বিতীয় শাখা খুলেছে খাইং খাইং কিয়াও। দ্বিতীয় শাখা প্রসঙ্গে গত মার্চে রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক কিয়াও শ্বে বলেন, ‘মিয়ানমারের গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে আমরা ব্যাংককে আরেকটি দোকান খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ সঙ্গে জানান, পাতায়া সমুদ্রসৈকত এবং চিয়াং মাইতে রেস্তোরাঁ খোলার পরিকল্পনা করছেন তারা।
থাইল্যান্ডে মিয়ানমারের ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি প্রসঙ্গে ব্যাংককের চুলালংকর্ন ইউনিভার্সিটির মিয়ানমার বিষয়ক গবেষক সু বলেন, ‘বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আর্থিক সম্পদ রক্ষায় তারা থাইল্যান্ডে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছেন। দ্রুত মুনাফা নয়, মিয়ানমারের ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য হলো স্থিতিশীল ব্যবসায়িক ভিত্তি তৈরি ও নিরাপদ স্থানে সম্পদ স্থানান্তর।’
অবশ্য থাইল্যান্ডে মিয়ানমারের জনসংখ্যার প্রকৃত কোনো পরিসংখ্যান নেই। গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে মিয়ানমারের ১৯ লাখ অভিবাসী বসবাস করছিলেন থাইল্যান্ডে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত ৫০ লাখ অভিবাসী থাইল্যান্ডে বসবাস করছেন। তাদের বেশির ভাগই এসেছেন ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির পরপর, যখন মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে নেয়।
এদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাধ্যতামূলক সামরিক বাহিনীতে যোগদানের খসড়া প্রকাশ প্রকাশ করে মিয়ানমার। এর পর থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি থেকে তরুণরা ব্যাপক হারে পালাতে থাকেন। এর ফলে থাইল্যান্ডে মিয়ানমারের ভোক্তাদের একটি অংশ হয়ে ওঠেন তরুণরা। এখন ঐতিহ্যবাহী মিয়ানমার রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে মোবাইল ফোনের দোকান বা ইলেকট্রনিকস খুচরা বিক্রেতা দোকানগুলো অভিবাসীদের জন্য কর্মসংস্থানের সহজ পথ হয়ে উঠছে। অভিবাসী ও শরণার্থীদের কাছে পরিচিত ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চাহিদাকে পুঁজি করে এগোচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
থাইল্যান্ডে ব্যবসা স্থানান্তর মিয়ানমারের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতিকেও তুলে ধরছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে সামরিক জান্তা। বাড়ানো হয়েছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক, নির্বাহী ও ব্যাংকারদের ওপর কড়াকড়ি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির অন্যতম কারণ হলো মিয়ানমারের মুদ্রার বিনিময় হার। এর বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এক বছর আগে ১ ডলারের বিপরীতে ৩ হাজার ৩০০ কিয়াট থেকে ৫ হাজার ৫০০ কিয়াটে নেমে এসেছে, যা জীবনযাত্রা ও ব্যবসায় খরচ আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
সামরিক শাসনের আগে ক্ষমতায় থাকা অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) অর্থনৈতিক কমিটির সদস্য ও অর্থনীতিবিদ সেইন তায় বলেন, ‘উচ্চ পরিবহন খরচ ও বিতরণের ক্ষেত্রে বিলম্ব হওয়ায় মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে আসছে।’
তিনি আরো জানান, ২০২৩ সালের শেষ দিকের গৃহযুদ্ধের পর মিয়ানমারের অর্থনৈতিক অবস্থা আরো নাজুক হয়েছে এবং ভোক্তা ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন কমছে। ফলে জাতীয় ভোগের বাজার সংকুচিত হচ্ছে।
গত জুনে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩ সালে মিয়ানমারে দারিদ্র্যের হার জনসংখ্যার ৩২ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২০ সালের ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে প্রায় দ্বিগুণ।
এদিকে চিয়াং মাই ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও জনপ্রশাসন বিভাগের প্রভাষক সিরাদা খেমানিত্তাথাই জানান, মিয়ানমারের নাগরিকদের পরিচালিত রেস্তোরাঁ ও দোকান বৃদ্ধি থাইল্যান্ডের সরবরাহ চেইনকে উপকৃত এবং সরকারি রাজস্ব বাড়াতে পারে।
Source : নিক্কেই এশিয়া।

ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি

ট্যাগঃ

মন্তব্য করুন

Leave a Reply




Contact Us