ভারতের বন্দরগুলোর গভীরতা তুলনামূলক কম। এ কারণে আন্তর্জাতিক রুটের বড় বড় জাহাজ কলম্বো, দুবাই ও সিঙ্গাপুরের বন্দরে ভিড়ত। এ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপ। এ গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকোনমিক জোন লিমিটেড কেরালার তিরুবনন্তপুরমে আরব সাগর পাড়ে ভিজিনজামে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করছে। এ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের পাশ দিয়েই বিশ্বের ৩০ শতাংশ কার্গো জাহাজ চলাচল করে। আদানি গ্রুপ বন্দরটির গভীরতা করছে ২৪ মিটারের বেশি। এসব কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজগুলো ভেড়ার জন্য এ বন্দর আদর্শ হয়ে উঠছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, দক্ষিণ ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট কনটেইনার বন্দরটিকে সম্প্রসারণ করতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে ১০ হাজার কোটি রুপি বা ১২০ কোটি ডলার করার পরিকল্পনা করেছে আদানি পোর্টস। এ বন্দরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে ভেড়াতে চায় তারা।
ভারতের গভীর সমুদ্রবন্দর ভিজিনজামের অবস্থান কেরালা রাজ্যে। বর্তমানে প্রকল্পটিতে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ চলছে, যা ২০২৮ সাল নাগাদ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০৪৫ সালে এর চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ শেষ হবে। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাঁচ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
এদিকে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে ভিজিনজাম বন্দরের উন্নয়নে আদানি ও কেরালা সরকার ২০ হাজার কোটি রুপি খরচ করবে।
জানা গেছে, ভিজিনজাম বন্দর ব্যবহারে বৃহত্তম কনটেইনার লাইনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে আদানি পোর্টস কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে রয়েছে এমএসসি মেডিটারিয়ান শিপিং কোম্পানি, এপি মোলার- মায়েরস্ক এ/এস ও হ্যাপাগ-লয়েড।
ভিজিনজাম বন্দর ভারতের একদম দক্ষিণতম প্রান্তের কাছে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক শিপিং রুটের কাছাকাছি এ বন্দরে রয়েছে জাহাজ চলাচলের উপযোগী বেশ গভীর চ্যানেল। এটি ইউরোপ, পারস্য উপসাগর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যের সঙ্গে সংযোগকারী পূর্ব-পশ্চিম শিপিং চ্যানেল থেকে মাত্র ১০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থিত।
১২ জুলাই পরীক্ষামূলকভাবে এ বন্দরের ৮০০ মিটার দৈর্ঘ্যের কনটেইনার বার্থের মাধ্যমে মায়েরস্ক থেকে প্রথম চালান গ্রহণ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে কনটেইনারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করছে চীন। ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী দেশটির আধিপত্য খর্ব করতে তৎপর ভারত। এক্ষেত্রে আদানির উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা দেশটির অর্থনৈতিক কৌশলের জন্য পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে।
মূলত ভূপ্রাকৃতিক ও অবকাঠামোগত কারণে এখন পর্যন্ত বড় কনটেইনার জাহাজ ভারতীয় বন্দর এড়িয়ে যাচ্ছে। কারণ এখানকার পোতাশ্রয়গুলো জাহাজ পরিচালনার মতো যথেষ্ট গভীর নয়। এর বদলে এতদিন কলম্বো, দুবাই ও সিঙ্গাপুরের মতো বন্দরে বড় জাহাজগুলো নোঙর করাতে হতো। অন্যদিকে ভিজিনজাম বন্দর এমন একটি স্থানে অবস্থিত যেখানে থেকে ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম দুই উপকূলে যোগাযোগ সহজ।
পরিকল্পিত ১০ হাজার কোটি রুপি বন্দরে বিদ্যমান বার্থের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ও ব্রেক ওয়াটার বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হবে বলে আদানি পোর্টসের সংশ্লিষ্ট সূত্রটি জানিয়েছে। ব্রেক ওয়াটার হলো সমুদ্রের মধ্যে নির্মিত পাথুরে বাধা, এর মাধ্যমে ঢেউয়ের আঘাত থেকে পোতাশ্রয়কে রক্ষা করা হয়।
অবশ্য বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা আগেই উল্লেখ করেছিল আদানি পোর্টস। গত বছরের অক্টোবরে বন্দর উদ্বোধনকালে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী পরিচালক করণ আদানি জানান, বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বছরে ৬ হাজার কোটি রুপি বিনিয়োগ করা হবে।
উদ্বোধনের পর আদানি পোর্টসের ওয়েবসাইটে বলা হয়, ভিজিনজাম বন্দরে জাহাজ দ্রুত ভিড়তে পারবে, আবার দ্রুত ঘুরেও যেতে পারবে। বিশ্বের বৃহত্তম মেগাম্যাক্স কনটেইনার জাহাজও এ বন্দরে ভিড়তে পারবে। প্রথম ধাপে এর সক্ষমতা ১০ লাখ টিইইউ (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কনটেইনারের একক) হলেও পরবর্তী পর্যায়ে আরো ৬২ লাখ টিইইউ সক্ষমতা যুক্ত হবে।
পণ্য চূড়ান্ত গন্তব্যে যাওয়ার কোনো এক অংশে অন্য কোনো বন্দরে জাহাজ থেকে জাহাজে স্থানান্তর করা হলে তাকে ট্রান্সশিপমেন্ট বলে। এ লক্ষ্যে ভিজিনজাম টার্মিনালে একাধিক পরিষেবা কাঠামো স্থাপন করছে আদানি গ্রুপ। এখানে জাহাজে জ্বালানি দেয়ার জন্য বাঙ্কারিং সুবিধা থাকবে। লোড-আনলোড সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত ক্রেন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া একটি ক্রুজ টার্মিনাল তৈরি করা হবে। যেখানে বিলাসবহুল বড় প্রমোদতরী ভিড়তে পারবে ও প্রয়োজনীয় পরিষেবা নেবে।
কৌশলগতভাবে ভিজিনজাম বন্দর ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি এমন আন্তর্জাতিক শিপিং রুটের কাছাকাছি অবস্থিত, যে পথ দিয়ে বৈশ্বিক কার্গো চালানের ৩০ শতাংশই চলাচল করে। এখানে রয়েছে প্রাকৃতিক চ্যানেল, যেখানে বন্দরের গভীরতা ২৪ মিটারের বেশি। এ কারণে ড্রেজিংয়ের প্রয়োজনীয়তাও নেই। সব মিলিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজগুলো ভেড়ানোর জন্য এ বন্দর ভারতের একটি আদর্শ অবকাঠামো।
সূত্র: ইকোনমিকস টাইমস।
ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি
ট্যাগঃ
মন্তব্য করুন