সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে যে, আমেরিকার মাথে সউদি আরবের পেট্রোডলার চুক্তি শেষ হতে চলেছে। কিন্তু অনেকের কাছেই এই “পেট্রোডলার বিষয়ের সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না। পেট্রোডলার চুক্তি নামে আলাদা কোনো চুক্তি সউদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হয়েছে কিনা এটাও নিশ্চিত করে অনেকেই বলতে পারবেন না। মূলত “পেট্রোডলার” বলতে আলাদা কোনো চুক্তি নেই। অনেক বিশেষজ্ঞ এটাকে “গোপন চুক্তি” বলে অভিহিত করেন। ৬০ বছর আগে মিশর ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিকপ্রাপ্ত একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সর্বপ্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন।
অনেকেই মনে করে থাকেন যে “পেট্রোডলার” মূলত পেট্রোল রপ্তানি অথবা বানিজ্য করা ডলারের মাধ্যমে অথবা অন্য মুদ্রা দিয়ে পেট্রোল বানিজ্য হলেও এটাকে ডলারে কনভার্ট করা হয়। এই পেট্রোলকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও সউদি আরবের মধ্যে কিন্তু একাধিক চুক্তি সম্পন্ন হয়। মূল ঘটনার সূত্রপাত ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাঈল যুদ্ধ থেকে। এই যুদ্ধে ইসরাঈলের বিরুদ্ধে মিশর ও সিরিয়া সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে ইসরাঈলকে সরাসরি সমর্থন করে। যুেদ্ধ আরবরা হেরে যায়। তখন সউদি আরবের নেতৃত্বে আরব দেশগুলি ঘোষণা দেয় যে, তাদের দেশ ইসরাঈলকে সহায়তাকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পেট্রোল দেবে না। তৎকালীন সময়ে পেট্রোলের দাম তুলনামূলকভাবে অনেক কম ছিলো।
সম্ভবত ১ ব্যারেল = ৩ ডলার অথবা ১ ব্যারেল= ৫ ডলার
আরব দেশগুলো যখন এই “অবরোধ ঘোষণা দেয়।তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোল সংকট দেখা দেয়। শীতকালে এই সংকট প্রবল আকার ধারণ করে। যার ফলশ্রুতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সউদি আরবের সাথে সমঝোতায় বসতে বাধ্য হয়। এই সমঝোতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেয় হেনরি কিসিঞ্জার অন্যদিকে সউদি আরবের নেতৃত্ব দেয় প্রিন্স ফাহাদ। এদিকে পেট্রোলের দাম নিষেধাজ্ঞার পরে অনেক বেড়ে যায় সউদি আরব অনুধাবন করতে পারে যে, তাদের দেশের মাটির নিচে যে পেট্রোলের ভান্ডার রয়েছে তারা যদি এটিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে তাহলে সউদি আরব অনেক বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করতে পারবে। এই পেট্রোলই হতে পারে সউদি আরবের অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার। নিষেধাজ্ঞার পরবর্তী সময়ে এই পেট্রোল বানিজ্য দিয়েই সউদি আরব অনেক বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে লাগলো। তখন তাদের মধ্যে বিনিয়োগের চিন্তা আসে। শুরুতে তারা বিভিন্ন দেশের মাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে। কিন্তু উল্লেখ করার মতো কোনো ফলাফল আসে নি।
এরপর তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের এই আহবানে সাড়া দেয়। এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব দেয় যে, পেট্রোল বিক্রির মাধ্যমে সউদি আরব যা আয় করতে করবে আমেরিকার ব্যাংকে তার একটি অংশ অথবা ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টে গচ্ছিত রাখতে হবে। বিনিময়ে সউদি আরবের অবকাঠামোগত উন্নয়নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবরকমের সহায়তা করবে। সউদি আরবে তারা দক্ষ জনবল পাঠাবে এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সউদি আরবের লোকদের সহায়তা করবে। এখন প্রশ্ন হলো সউদি আরবে গিয়ে আমেরিকার লোকেরা কাজ করছে তাদের বেতন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কে দিবে এবং কিসের ভিত্তিতে হবে? আমেরিকার তরফ থেকে বলা হয়, তাদের বেতন আমেরিকাই দিবে তবে তা হবে আমেরিকার ব্যাংক অথবা ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টে সউদি আরবের রাখা গচ্ছিত অর্থ থেকেই। এই অর্থ দিতে হবে মূলক বাজেট পেশ হবার এক বছর আগে।
আমেরিকার এই প্রস্তাব সউদি আরব ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। তারা উপলব্ধি করে যে, অন্য কোনো দেশ সউদি আরবকে এভাবে সহায়তা করবে না। এদিকে পেট্রোলের বিশাল ভান্ডার এবং এই পেট্রোলকে পুঁজি করে অর্থনৈতিকভাবে সউদি-আরব সমৃদ্ধশালী হবার সম্ভাবনা রয়েছে। তখনই তারা নিরাপত্তা বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যাপারে সউদি আরবকে অভয় দেয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তার ব্যাপারে সউদি আরবকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অস্ত্র এবং সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ এর মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলার কথা বলে। এই বিষয়গুলিকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সউদি আরবের মধ্যে একটি কমিশন বোর্ড গঠিত হয়। ১৯৭৪ সালে দুই দেশের মধ্যে দুইটি চুক্তি স্বক্ষণিত হয়। একটি হলো “সউদি আরব-যুক্তরাষ্ট্র সম্মিলিত অর্থনৈতিক চুক্তি এবং অপরটি হলো “সউদি আরব – যুক্তরাষ্ট্র সম্মিলিত নিরাপত্তা চুক্তি”
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সউদি আরবের মধ্যে একাধিক বিষয়ে চুক্তি হয়। অনেকেরই ধারণা এসব চুক্তি পেট্র্রোডলার চুক্তি। ১৯৮০ সালের দিকে সউদি আরব ও আমেরিকার মধ্যে প্রায় ১৬-২০ টির মতো চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। ১৯৯০ সালের দিকে আরো বেশি। পেট্রোডলার চুক্তি নামে পৃথকভাবে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করে অনেকেই বলতে পারবেন না।
নিষেধাজ্ঞার পূর্বে সউদি আরব যে পেট্রোল বিক্রি করতো তার সিংহভয়াই আমেরিকা কিনতো। যার কারণে যখনই সউদি আরব পেট্রোল মরবরাহ করা বল বন্ধ করে দেয় তখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভয়াবহ সংকটের মধ্যে পড়ে। ২০০০ মালের পর সউদি আরব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ ধরনের কোনো চুক্তি
দেখা যায় নি। তবে ধারণা করা হয় যে, সউদি-আরব এবং আমেরিকার মধ্যেকার চুক্তির মেয়াদ ২০১৮ সাল পর্যন্ত ছিলো। সাম্প্রতিক সময়গুলি পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে আমেরিকা নিজেই তেল উৎপাদন করে থাকে অন্যদিকে সউদি-আরব ও অন্যান্য দেশগুলির সাথে বানিজ্য করছে। যার ফলে “একক নির্ভরশীলতা” অনেকটাই কমে গিয়েছে। এদিকে নিরাপত্তা চুক্তির পর থেকেই আমেরিকা সউদি আরবকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করে আসছিলো। ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর, তুরস্কের ইস্তাম্বুলের সউদি কনস্যুলেটে সউদি সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ডর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সহায়তা অনেকখানি কমে যায়।
ক্যাটাগরিঃ অর্থনীতি
ট্যাগঃ
মন্তব্য করুন